অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা বলে তারা পাতায় পাতায় অস্বীকার
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসিতে বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ
টু-থার্ড মেজরিটি নিয়ে ক্ষমতায় আসার মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই বিএনপি সরকার জনগণের বিতৃষ্ণার শিকার হতে শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনেরা। তাদের অভিযোগ, সংস্কার নিয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার ৭০ শতাংশ জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান করছে। ফলে সরকার দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাতে শুরু করেছে, যা শুধু বিএনপির জন্য নয়, রাষ্ট্রের জন্যও বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেন তারা।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি গভর্নেন্স’ আয়োজিত ‘সরকারের ৬ মাস: প্রত্যাশা, প্রাপ্তি ও ঘাটতির মূল্যায়ন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই সনদ ছিলো জুলাই বিপ্লবে অংশ নেয়া মানুষের আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপ। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দলগুলো এতে স্বাক্ষর করেছিলো। তাদের প্রত্যাশা ছিলো, নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর রাষ্ট্রকাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে এবং এর অন্যতম অংশ হবে সংবিধান সংস্কার।
তিনি বলেন,
জুলাই সনদ ছিলো জুলাই বিপ্লবের সব মানুষের আকাঙ্ক্ষার একটি বাস্তব রূপ। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল সব রাজনৈতিক দল এতে স্বাক্ষর করেছিলো। তারা চেয়েছিলো, নতুন সরকার আসার পর পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর চেহারা বদলে দেবে, যার মধ্যে সংবিধান সংস্কারও ছিলো।
তাজুল ইসলাম বলেন,
এতোদিনে সংসদের উচ্চকক্ষ বা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, সুপ্রিম কোর্ট ও পুলিশ প্রশাসনের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার শুরু হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তার কোনোটি এখনও বাস্তবে শুরু হয়নি।
তিনি বলেন, সরকারপ্রধান ও বিরোধী দলের নেতারা বারবার জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা বলছেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি দেখে বিষয়টি এখন তার কাছে কৌতুককর মনে হচ্ছে।
তাজুল ইসলাম বলেন,
অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা বলে তারা পাতায় পাতায় তা অস্বীকার করে যাচ্ছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদ হলো না, কেনো হলো না—তা জানি না।
তিনি আরও বলেন, একজনের কারণে সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি এবং সংবিধান সংস্কারের কাজ শুরু হয়নি। অথচ অন্যরা নীরবে তা সমর্থন করে গেছেন।
বিএনপির নীতিগত অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সাবেক এ প্রধান প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অতীতে ১৯৭২ সালের সংবিধানের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তিনি এমনও বলেছিলেন, সংবিধান এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এটি ডাস্টবিনে বা ময়লার স্তূপে ফেলে দেয়া উচিত।
তাজুল ইসলাম বলেন, বিএনপির একজন অবিসংবাদিত নেতা যখন ওই সংবিধান নিয়ে এমন মন্তব্য করেছিলেন, তখন আজ তার দল কীভাবে বলছে যে ১৯৭২ সালের সংবিধানের বাইরে যাওয়া তাদের নীতিগত অবস্থান নয়—এটি তার কাছে প্রশ্নের বিষয়।
তিনি বলেন, দেশকে বদলে দেয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই বিপুলসংখ্যক মানুষ জীবন দিয়েছেন। বর্তমান প্রজন্ম রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন চায়। তাই জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও রায়কে গুরুত্ব দিয়ে সংস্কার বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, উপাচার্য ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
তিনি প্রশ্ন করেন, অতীতে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় বিএনপি সরকারের আমলে কোনও দলীয় ব্যক্তিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয়েছিলো কি না। তার জানা মতে, এমন নজির নেই।
অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন,
একজন শাসক যতই সৎ হোন না কেনো, তার চারপাশ যদি লোভী, ধান্দাবাজ ও চাটুকারদের দিয়ে ঘিরে যায়, তাহলে তিনি আর বাস্তবতা সঠিকভাবে দেখতে ও বুঝতে পারেন না।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে বেশি সময় নেননি। কারণ তার চারপাশে চাটুকার ও লুটেরারা অবস্থান নিয়েছিলো।
বক্তারা বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা নিয়ে জুলাইয়ের আন্দোলন ও গণভোটের মধ্য দিয়ে জনগণ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, সে আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করা হলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা দ্রুত কমে যেতে পারে।
তাদের মতে, সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে যদি বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়, তাহলে তা শুধু সরকারের জনপ্রিয়তাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়াকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি গভর্নেন্সের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হক। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মিজানুর রহমান। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সবার দেশ/কেএম




























