বার নির্বাচনে ‘ব্যাপক অনিয়ম’, প্রধানমন্ত্রীকে ইউরোপীয় আইনজীবী সংস্থার চিঠি
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা বার ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে গুরুতর অনিয়ম, প্রার্থীদের বাধা দেয়া এবং রাজনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগ তুলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপের আইনজীবী সমিতিগুলোর শীর্ষ সংগঠন কাউন্সিল অব বারস অ্যান্ড ল সোসাইটিজ অব ইউরোপ (সিসিবিই)।
সংস্থাটি বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি দিয়ে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সিসিবিই সভাপতি রোমান জাভর্শেক স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আইনজীবীদের ন্যায্য অধিকার ও স্বাধীন পেশাগত কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ‘ইরেগুলারিটিজ ইন সেভারেল ডিস্ট্রিক্ট বার ইলেকশনস’ শিরোনামের চিঠিটি সংগঠনটি তাদের ফেসবুক পেজেও প্রকাশ করেছে।
ইউরোপের ৪৬টি দেশের ১০ লাখের বেশি আইনজীবীর প্রতিনিধিত্বকারী এ সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বিভিন্ন জেলা বার ও সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অংশগ্রহণে বাধা দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ফ্রান্সভিত্তিক সংগঠন জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশ (জেএমবিএফ)-এর তথ্যের বরাত দিয়ে চিঠিতে বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে মনোনয়নপত্র জমা দিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। কিছু প্রার্থীকে শারীরিকভাবে হয়রানি করা হয়েছে এবং ‘ফ্যাসিস্টদের সহযোগী’ আখ্যা দিয়ে তাদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সিসিবিই আরও দাবি করেছে, কিছু ক্ষেত্রে পুলিশি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ‘পূর্ববর্তী সরকারের সহযোগী’ অভিযোগ তুলে অনেক আইনজীবীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে তিনটি প্রধান দাবি জানানো হয়েছে। সেগুলো হলো—বার নির্বাচনে সকল আইনজীবীর সমান ও বৈষম্যহীন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নির্বাচনী অনিয়ম ও সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং আইনজীবীরা যেন ভয়ভীতি ও হয়রানি ছাড়া স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া আইনজীবীদের ভূমিকা সম্পর্কিত জাতিসংঘের মৌলিক নীতিমালার ১৬, ১৭, ১৮ ও ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি। এসব অনুচ্ছেদে আইনজীবীদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয় উল্লেখ রয়েছে।
পাশাপাশি আইন পেশার সুরক্ষা সংক্রান্ত নতুন ইউরোপীয় কনভেনশনে বাংলাদেশকে স্বাক্ষর ও অনুমোদনের আহ্বানও জানিয়েছে সিসিবিই।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন-এর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি হুমায়ুন কবির মন্জু বলেন, তিনি এ চিঠির বিষয়ে অবগত নন।
তবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোতাহের হোসেন সাজু বলেন, বার নির্বাচনে অনিয়ম-কারচুপি নিয়ে ইউরোপের আইনজীবীদের উদ্বেগ আমাদের জন্য লজ্জার। তিনি আইন অঙ্গনে এমন অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রধান উপদেষ্টা ও আইনমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এদিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন বাতিল হওয়া আইনজীবী উপমা বিশ্বাস বলেন, আন্তর্জাতিক একটি সংস্থা সরাসরি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার কাছে বিষয়টি তুলে ধরায় অভিযোগগুলোর গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, আইনজীবীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার এবং বার নির্বাচনে সবার সমান অংশগ্রহণের সুযোগ—এগুলো আইনের শাসনের মূল ভিত্তি।
উপমা বিশ্বাস আরও বলেন, তার মনোনয়ন গ্রহণ করা হলে তিনি খ্রিষ্টান সম্প্রদায় থেকে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রথম প্রার্থী হতেন। মানুষ আমাদের কাছে আসে ন্যায়বিচারের আশায়। কিন্তু আমরা যদি নিজেরাই নিজেদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে সে আস্থার জায়গা কীভাবে ধরে রাখবো?—প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তার ভাষায়, বিষয়গুলো দ্রুত ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে দেশের বিচারব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা অক্ষুণ্ণ থাকে।
সবার দেশ/কেএম




























