Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০১:০৫, ৯ আগস্ট ২০২৬

যেভাবে বদলে যায় বাংলাদেশের ইতিহাস

সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভব

সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভব
ছবি: সবার দেশ

আজকের পর্বে থাকছে: বঙ্গভবনের বৈঠকের অন্দরমহল, খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্ত, আকাশসীমা বন্ধের নির্দেশ, ‘আয়নাঘর’ প্রসঙ্গ এবং ছাত্রনেতাদের বঙ্গভবনে ডাকার নেপথ্যের ঘটনা।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে রাজধানীর রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে বঙ্গভবন। একদিকে রাজপথে হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রশ্নে রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবনে বসে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর সৃষ্ট ক্ষমতার শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সচল রাখা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সে বৈঠকে মুখোমুখি হন রাজনৈতিক নেতা, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা।

সন্ধ্যার বঙ্গভবন

মাগরিবের নামাজের পরপরই রাজনৈতিক নেতাদের বহর বঙ্গভবনে পৌঁছায়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাষ্ট্রপতি বৈঠক কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সেনাপ্রধান, বিভিন্ন বাহিনীর প্রধান, গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক।

মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর পরে বৈঠকের পরিবেশের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, পুরো কক্ষজুড়ে তখন এক ধরনের চাপা উদ্বেগ কাজ করছিলো। সবাই জানতেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে গেছে। ফলে প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অপর পাশে বসেছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, ডিজিএফআই প্রধান, অন্যান্য বাহিনীর প্রধান এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রথম আলোচনাই খালেদা জিয়ার মুক্তি

বৈঠক শুরু হওয়ার পর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রসঙ্গ।

উপস্থিত নেতাদের অনেকেই মনে করেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়া প্রয়োজন।

আলোচনার একপর্যায়ে জাতীয় পার্টির একজন প্রতিনিধি আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেন। তখন অধ্যাপক আসিফ নজরুল যুক্তি দেন, খালেদা জিয়ার কারাবাসই ছিলো অন্যায্য; ফলে তাকে মুক্তি দিতে নতুন করে কোনও জটিল আইনি ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।

মেজর জেনারেল (অব.) আকবরের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি শুরুতে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন। তিনি মত দেন, যেহেতু নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, তাই নতুন প্রশাসন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

ঠিক সে মুহূর্তে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান হস্তক্ষেপ করেন বলে দাবি করেন আকবর।

তার বর্ণনা অনুযায়ী, সেনাপ্রধান রাষ্ট্রপতিকে বলেন, সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমা প্রদর্শনের সাংবিধানিক ক্ষমতা দিয়েছে। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় খালেদা জিয়াকে দ্রুত মুক্তি দেয়াই হবে যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত।

পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয়।

রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

খালেদা জিয়ার মুক্তির আলোচনা শেষ হওয়ার পর বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।

ডিজিএফআই প্রধান বৈঠকে জানান, রাজধানীর বিভিন্ন থানায় হামলা হয়েছে, বহু অস্ত্র লুটের খবর পাওয়া যাচ্ছে এবং পুলিশের বড় একটি অংশ কার্যত দায়িত্ব পালন করতে পারছে না।

পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে—এমন আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়।

মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বৈঠকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেন বলে তার সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন।

প্রথমত, তিনি বলেন, সেনাবাহিনী সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে পুলিশের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা জরুরি।

তার মতে, যেসব ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা আন্দোলন দমনে সামনের সারিতে ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নেয়া হলে জনরোষ কমবে এবং সাধারণ পুলিশ সদস্যরা আবার দায়িত্ব পালনে ফিরে আসতে উৎসাহিত হবেন।

আকাশপথে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা

দ্বিতীয় প্রস্তাবে আকবর দাবি করেন, সে সময়ও প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি দেশত্যাগের চেষ্টা করছিলেন।

তিনি বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরে আকাশসীমা সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি শোনার পর বিমানবাহিনী প্রধান তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন এবং জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কোনো উড়োজাহাজকে ছাড়পত্র দেয়া হবে না।

যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সে সময় কোনও পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি, তবে বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজনের বক্তব্যে বিষয়টি উঠে এসেছে।

‘আয়নাঘর’ প্রসঙ্গ

বৈঠকের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি ছিলো ‘আয়নাঘর’ ইস্যু।

মেজর জেনারেল (অব.) আকবরের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠক চলাকালে তিনি রাষ্ট্রপতিকে জানান, ডিজিএফআই সদর দফতরের সামনে লোকজন জড়ো হয়ে গোপন বন্দিশালায় আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি জানাচ্ছেন।

তিনি দাবি করেন, বিষয়টি শুনে রাষ্ট্রপতি বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং জানতে চান, সত্যিই কি এমন কোনও বন্দিশালা রয়েছে?

এরপর রাষ্ট্রপতি ডিজিএফআই প্রধানের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে গেলে সেনাপ্রধান বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন বলে আকবরের দাবি।

তার ভাষ্যমতে, সেনাপ্রধান বলেন, পুরো বিষয়টির দায়িত্ব তিনি নিচ্ছেন এবং যাদের আটকে রাখা হয়েছে, তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করা হবে।

এ বক্তব্যের পর বৈঠকে উপস্থিতদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আর আলোচনা এগোয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ছাত্রনেতাদের যুক্ত করার সিদ্ধান্ত

বৈঠক যত এগোতে থাকে, ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে নতুন সরকার গঠন করা সম্ভব হবে না।

রাজপথে যে আন্দোলন সরকার পতনের পথ তৈরি করেছে, সে ছাত্রনেতাদের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ—এমন ঐকমত্য তৈরি হতে থাকে।

রাত প্রায় ১১টার দিকে অধ্যাপক আসিফ নজরুলকে দায়িত্ব দেয়া হয় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার।

উদ্দেশ্য ছিলো, তাদের বঙ্গভবনে এনে রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সুযোগ করে দেয়া।

এ সিদ্ধান্তই পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামো নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে।

কারণ এরপর শুরু হয় নতুন প্রশ্ন—দেশের পরবর্তী সরকার কে পরিচালনা করবেন? কেমন হবে সে সরকার? রাজনৈতিক নেতৃত্ব থাকবে, নাকি অরাজনৈতিক কোনও ব্যক্তিত্বের হাতে দায়িত্ব যাবে?

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই শুরু হয় আরেক দফা নাটকীয় আলোচনা, যেখানে উঠে আসে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম।

(চলবে)

পরবর্তী (চতুর্থ) পর্বে থাকবে—কার্জন হলে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠক, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম কীভাবে সামনে আসে, তার সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ, বিএনপি-জামায়াতের ভূমিকা এবং প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন প্রক্রিয়ার নেপথ্যের বিস্তারিত।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

শীর্ষ সংবাদ:

হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ মানা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পথ নেই: ইরান
প্রদর্শনীতে মুজিব থাকলেও জিয়া নেই কেনো—জবাব দিলেন জামায়াত আমির
দক্ষিণ সুদান ও আবেইতে ৫ দিনের সফরে সেনাপ্রধান
বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানির খবর ‘অসত্য ও কাল্পনিক’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মাঠে জামায়াত, রোববার চূড়ান্ত হবে প্রার্থী
সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভব
৫ আগস্ট প্রাণনাশের শঙ্কায়ও দায়িত্বে ছিলাম: সাহাবুদ্দিন চুপ্পু
সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন
ভারতীয় হাইকমিশনকে তলবের দাবি নাহিদ ইসলামের
বিয়ের খাবার নিয়ে বর ও কনেপক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১০
সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সতর্ক করলো পুলিশ
বিএনপি আইসিইউতে গেলে আমি বাঁচাই: রুমিন ফারহানা
ইতালি বিমানবন্দরে ২৬০ যাত্রী নিয়ে আটকা ঢাকাগামী বিমান
হাসিনার সঙ্গে দেশে ফিরতে চান সাকিব
মিরপুরে বিএনপি নেতাকে গুলি করলো যুবলীগ
পাকিস্তানে বাংলাদেশের আনারস রফতানির দ্বার উন্মুক্ত
নরসিংদীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল