সলিমপুর অভিযান: বোরকা পরে পালালেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসী গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বড় ধরনের অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ দল। সোমবার (৯ মার্চ) ভোর থেকে প্রায় তিন হাজার সদস্যের অংশগ্রহণে এ অভিযান শুরু হয়। এখন পর্যন্ত কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে স্থানীয় সূত্রে গুঞ্জন উঠেছে, অভিযানের অন্যতম টার্গেট শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. ইয়াছিন অভিযান শুরুর আগেই বোরকা পরে এলাকা থেকে পালিয়ে গেছেন। ভোরের দিকে জঙ্গল সলিমপুরের একটি গোপন পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে তিনি নারী বেশে সরে পড়েন বলে দাবি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, র্যাব কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব ভূঁইয়া হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেফতারে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে যৌথ বাহিনী। ওই মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন, নুরুল হক ভান্ডারী, ফারুকসহ বেশ কয়েকজনের নাম রয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, প্রশাসনের অন্যতম টার্গেট ইয়াছিন ভোরের আলো ফোটার আগেই একটি গোপন পথ ব্যবহার করে এলাকা ছাড়েন। এ সময় তাকে বোরকা পরিহিত অবস্থায় কয়েকজন দেখেছেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের খবর পেলেই ইয়াছিন প্রায়ই নারী বেশে পালিয়ে যান। কখনও কখনও তিনি সিএনজি অটোরিকশা চালকের ছদ্মবেশেও দুর্গম এলাকা ছেড়ে সরে পড়েন।
অভিযান পরিচালনার জন্য যৌথ বাহিনীর সদস্যদের কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়েছে। একটি দল পাহাড়ের নিচের বসতিগুলোতে তল্লাশি চালাচ্ছে, আরেকটি দল পাহাড়ি পথ ধরে ওপরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সম্ভাব্য পালানোর পথগুলোতেও আগে থেকেই চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
অভিযানে অংশ নেয়া একটি সূত্র জানায়, জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরে একাধিক পাহাড়ি ছড়া, ঘন ঝোপঝাড় ও পরিত্যক্ত ঘর রয়েছে। এসব জায়গাকে প্রায়ই অপরাধীরা আত্মগোপনের জন্য ব্যবহার করে। তাই সদস্যরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালাচ্ছেন। অনেক জায়গায় পাহাড়ি পথ এতটাই সরু যে একসঙ্গে কয়েকজনের বেশি চলাচল করা সম্ভব নয়। এ কারণে ধাপে ধাপে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ বাড়ে। প্রথমে স্থানীয় এক যুবদল নেতার নিয়ন্ত্রণে এলাকা থাকলেও পরে আধিপত্যের দ্বন্দ্বে কয়েক দফা সংঘর্ষ ঘটে।
আরও পড়ুন <<>> চট্টগ্রামে ভোর থেকে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান
এরপর গত বছরের ৩০ আগস্ট সেনাবাহিনী সেখানে অভিযান চালিয়ে চার সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে এবং বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার করে। সে ঘটনার পর ধীরে ধীরে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেয় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইয়াছিনের নেতৃত্বে জঙ্গল সলিমপুর ও ভেতরের আলীনগর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে প্লট তৈরি করা হচ্ছে। আবাসিক সমিতির নামে হাজার একরের বেশি সরকারি খাস পাহাড় কেটে সেখানে শত শত প্লট তৈরি করা হয়েছে। এসব প্লট বিক্রি করে তিনি শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্যসহ নানা অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে স্থানীয়দের দাবি।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালাতে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব ভূঁইয়া নিহত হন। তিনি র্যাব-৭ এর উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
এ ঘটনার তিন দিন পর সীতাকুণ্ড থানায় ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত ওই মামলার উল্লেখযোগ্য কোনও আসামিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
এর আগে গত বছরের ৫ অক্টোবর জঙ্গল সলিমপুরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘এখন’-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান হোসাইন আহমেদ জিহাদ ও তার সঙ্গে থাকা ক্যামেরাম্যান।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলমান থাকবে।
সবার দেশ/কেএম




























