Sobar Desh | সবার দেশ চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১০:৩১, ১৪ জুন ২০২৫

চাকরির নামে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো চক্রের মূলহোতা গ্রেফতার

চাকরির নামে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো চক্রের মূলহোতা গ্রেফতার
ছবি: সংগৃহীত

চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের রাশিয়া হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো একটি মানব পাচার চক্রের মূলহোতা মুহাম্মদ আলমগীর হোছাইনকে (৪০) গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

গত ১২ জুন (বুধবার) ভোরে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করে সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ শাখা (টিএইচবি)।

সিআইডির তথ্যমতে, চক্রটি প্রলোভন দেখাতো—রাশিয়ার একটি চকলেট কারখানায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা বাবুর্চির চাকরি মিলবে মাসে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা বেতনে। এভাবে প্রাথমিকভাবে ১০ জনকে সৌদি আরবে পাঠানো হয় ওমরাহ ভিসায়। পরে তাদের রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়, যিনি পরবর্তীতে তাদের রুশ সেনাদের কাছে হস্তান্তর করেন। সেখানে তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োজিত করা হয়।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানান, বনানী থানায় গত ৪ ফেব্রুয়ারি দায়ের হওয়া মানব পাচার মামলায় আলমগীরকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন এবং আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আলমগীর চট্টগ্রামের লোহাগড়া উপজেলার আমতলী মাঝেরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।

তদন্তে সিআইডি জানতে পারে, চক্রটি ভুক্তভোগীদের ওমরাহ করানোর পর রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে তাদের এক ‘সুলতানের’ কাছে হস্তান্তর করতো। তিনি আবার তাদের রুশ সেনাদের কাছে ‘দাস’ হিসেবে দিয়ে দিতেন। সেখানে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো এবং যুদ্ধ করতে অস্বীকার করলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো।

ইতোমধ্যে নাটোরের সিংড়া উপজেলার হুমায়ুন কবির যুদ্ধে নিহত হয়েছেন এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জের আমিনুল ইসলাম গুরুতর আহত হয়ে এখনো ভুগছেন। পালিয়ে আসা নরসিংদীর আকরাম হোসেন দেশে ফিরে এসব তথ্য ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে প্রকাশ করেন। পরে যুদ্ধাহত আমিনুলের স্ত্রী ঝুমু আক্তার বনানী থানায় মামলা দায়ের করেন।

সিআইডি আরও জানায়, সৌদি আরবে থাকা অপর ১০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যেতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেয়া হয়। ফলে তারা দেশে ফিরতে পারছেন না বা অন্য কোনো কাজেও নিয়োজিত হতে পারছেন না।

এ চক্রের অপর সদস্য ফাবিহা জেরিন ওরফে তামান্নাকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নেপালে পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেফতার করা হয়। তিনি বনানীর ‘ড্রিম হোম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস লিমিটেড’-এর অংশীদার বলে জানা গেছে।

সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গ্রেফতার আলমগীর ২০০৮ সালে ছাত্র ভিসায় রাশিয়ায় যান এবং পরে বিয়ে করে দেশটির নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তিনি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে তিন ধরণের ভিসায় প্রায় ৫০ জনকে রাশিয়ায় নিয়ে গেছেন। এর মধ্যে গত এক বছরে ১১ জনকে সেনা ক্যাম্পে কাজ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুদ্ধে বাধ্য করেছেন।

সিআইডির তথ্যমতে, রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে অন্তত তিন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। রুশ সরকার এদের মধ্যে দুজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে এবং তাদের মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

এ চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে তাদের পুরো নেটওয়ার্ক ধ্বংস এবং ভুক্তভোগীদের দেশে ফিরিয়ে আনার কাজ অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

সবার দেশ/কেএম

সর্বশেষ