শরীয়তপুরে তীব্র ক্ষোভ
‘অ্যাম্বুলেন্স চক্র’র দৌরাত্বে জিম্মি রোগীর মৃত্যু, অসহায় স্বজনরা
শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল থেকে ঢাকায় নেয়ার পথে দুই দফায় রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এতে দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থাকার পর ঢাকার হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই এক বৃদ্ধ রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা।
মারা যাওয়া ব্যক্তির নাম জমশেদ আলী ঢালী (৭০)। তিনি শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার কুতুবপুর গ্রামের বাসিন্দা। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বিকেলে ঢাকায় নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল এলাকার একটি অ্যাম্বুলেন্স চক্রের সদস্যরা ঢাকা-শরীয়তপুর সড়কের কোটাপাড়া ও নড়িয়ার জামতলা এলাকায় দুই দফায় রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি আটকে রাখেন। এতে মোট দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় নষ্ট হয়। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় অ্যাম্বুলেন্সটি ছাড়িয়ে নেয়া হলেও ততক্ষণে রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে। ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই জমশেদ আলী মারা যান।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে জমশেদ আলী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সকাল নয়টার দিকে তাকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা তাকে স্ট্রোকজনিত সমস্যায় আক্রান্ত বলে শনাক্ত করেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেন।
রোগীর স্বজনেরা বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সদর হাসপাতাল চত্বর থেকে ছয় হাজার টাকায় একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেন। তবে রোগী ওঠানোর পর চালক অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করেন। এতে রাজি না হয়ে স্বজনেরা পরিচিত এক চালকের অ্যাম্বুলেন্স পাঁচ হাজার টাকায় ভাড়া করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
এ সময় স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের সদস্যরা ক্ষুব্ধ হয়ে দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা-শরীয়তপুর সড়কের কোটাপাড়া এলাকায় ওই অ্যাম্বুলেন্সটি আটকে দেন। তাদের দাবি ছিলো, স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স বাদ দিয়ে কেন বাইরের অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নেয়া হচ্ছে।
জমশেদ আলীর নাতি জোবায়ের হোসেন অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় সিন্ডিকেটের অ্যাম্বুলেন্স না নেয়ায় তারা আমাদের গাড়িটি দুই জায়গায় আটকে দেড় ঘণ্টা সময় নষ্ট করে। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় আমরা ঢাকার দিকে রওনা হই। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই আমার নানার মৃত্যু হয়।
স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে প্রায় ৪০ মিনিট পর প্রথম দফায় অ্যাম্বুলেন্সটি ছাড়লেও নড়িয়ার জামতলা এলাকায় গিয়ে আবারও সেটি আটকে দেয়া হয়। সেখানে আরও প্রায় ৫০ মিনিট বাগ্বিতণ্ডার পর গাড়িটি ছেড়ে দেয়া হয়। এরপর দ্রুত ঢাকার দিকে যাত্রা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর মঙ্গলবার রাত আটটার দিকে নিহতের স্বজনেরা লাশ নিয়ে শরীয়তপুরের পালং মডেল থানায় যান এবং বিষয়টি মৌখিকভাবে পুলিশকে জানান। পুলিশ লিখিত অভিযোগ দিতে বলেছে বলে জানিয়েছেন তারা।
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসক রাশেদ আহমেদ জানান, সকালে এক বৃদ্ধ রোগী স্ট্রোকের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন এবং তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেয়া হয়। তবে যাওয়ার পথে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিছু জানে না।
এ ধরনের ঘটনা শরীয়তপুরে নতুন নয়। গত বছরের ১৪ আগস্ট শরীয়তপুর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ঢাকাগামী একটি অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখার ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্সে থাকা এক নবজাতকের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় মামলা হয়েছিলো এবং কয়েকজনকে আসামি করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত অ্যাম্বুলেন্সচালক সুমন খান মুঠোফোনে বলেন, ঢাকায় চলাচলকারী একটি অ্যাম্বুলেন্স কেন শরীয়তপুর হাসপাতাল থেকে রোগী তুলছে, তা জানতে চেয়েছিলেন মাত্র। তিনি কোনও অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখেননি বলে দাবি করেন।
পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, ঘটনাটি মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। রোগী পরিবহনের মতো জরুরি সেবাকে কেন্দ্র করে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সবার দেশ/কেএম




























