ইরানে বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় সেনাদের মধ্যে ক্ষোভ
ইরান যুদ্ধে যেতে অনাগ্রহী মার্কিন সেনারা
ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য যুদ্ধে অংশ নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের বহু সেনাসদস্য। সামরিক সংশ্লিষ্ট গোপন তথ্য ও বিভিন্ন সংস্থার বক্তব্যে জানা গেছে, অনেক মার্কিন সেনা ইরানে যুদ্ধ করতে চান না এবং এ বিষয়ে আপত্তি জানাতে তারা বিভিন্ন সহায়তাকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বিবেকগত কারণে যুদ্ধে অংশ নিতে অনিচ্ছুকদের সহায়তা দেয়া অলাভজনক সংস্থা সেন্টার অন কনসায়েন্স অ্যান্ড ওয়ার। সংস্থাটি জানায়, ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মার্কিন সেনাদের ফোনকল তাদের কাছে অবিরাম আসছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সোশ্যাল মিডিয়া এক্সে দেয়া এক পোস্টে জানান, ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে সেনাদের মধ্যে তীব্র বিরোধিতা তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, এ পরিস্থিতি ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ ২০০৩–এর সময় দেখা দেয়া বিরোধিতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মাইক প্রিসনার এক্সে লিখেছেন, তাদের ফোন অবিরাম বেজে চলেছে। তিনি বলেন, জনসম্মুখে যত ইউনিট মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি ইউনিটকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে তারা তথ্য পাচ্ছেন।
গত সপ্তাহে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বিশেষ বাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে বৃহৎ পরিসরে সেনা মোতায়েনের গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে।
এদিকে মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের বিখ্যাত স্থলযুদ্ধ ইউনিট ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন–এর কিছু সেনার একটি বড় প্রশিক্ষণ মহড়া বাতিল করেছে, যা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অন্যদিকে মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজ–কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট যুক্তরাষ্ট্রে আবার বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ বা ‘ড্রাফট’ চালুর সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ চালু হয়েছিলো ভিয়েতনাম যুদ্ধ–এর শেষ দিকে, ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে।
যুদ্ধে আপত্তিকারীদের সহায়তা দেয়া সংস্থা সেন্টার অন কনসায়েন্স অ্যান্ড ওয়ার জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই কিছু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদেশি যুদ্ধে অংশ নেয়ার বিরোধিতার ঐতিহ্য রয়েছে। বিশেষ করে কোয়েকার ও অ্যামিশ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে নৈতিক বা ধর্মীয় কারণে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান দেখা যায়।
সংস্থাটি আরও দাবি করেছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন আশঙ্কা থেকেই তাদের কাছে বিপুলসংখ্যক ফোনকল আসছে। অনেক সেনা শুধু ব্যক্তিগতভাবে আপত্তি জানাচ্ছেন না, বরং তাদের ইউনিটের ভেতরেও ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান রয়েছে বলে জানাচ্ছেন।
একটি পোস্টে সংস্থাটি জানায়, সোমবার তারা এক মার্কিন সেনাসদস্যের ফোন পান, যাকে মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিলো। তিনি নিজেকে ‘বিবেকগত আপত্তিকারী’ হিসেবে নথিভুক্ত করতে চান এবং জানিয়েছেন, তার ইউনিটের অনেক সদস্যও ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন।
এদিকে দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনাও মার্কিন সেনাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ওই হামলায় অন্তত ১৬৫ জন শিশু নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই স্কুলছাত্রী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্কুলটিতে পরপর দুটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। প্রথম হামলার পর উদ্ধারকাজ চলার সময় দ্বিতীয় হামলা চালানো হয়, যাকে সামরিক পরিভাষায় ‘ডাবল-ট্যাপ স্ট্রাইক’ বলা হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস–সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ হামলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি প্রকাশিত একটি ভিডিওতে একটি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে স্কুলের কাছের একটি নৌঘাঁটিতে আঘাত করতে দেখা গেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। গত শনিবার ট্রাম্প উল্টো ইরানকেই দায়ী করে দাবি করেন, তাদের ‘অনির্ভুল’ গোলাবারুদের কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে।
পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে উন্নত রাডার স্টেশন, সামরিক ঘাঁটি, এমনকি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ–এ অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের একটি অংশ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
সবার দেশ/কেএম




























