তারেক-জুবাইদার বিচার ছিলো পক্ষপাতদুষ্ট: হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় নিম্ন আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম ও পক্ষপাতের অভিযোগ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন হাইকোর্ট। সোমবার (১৪ জুলাই) প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারিক আদালতের আচরণকে ‘নিরপেক্ষতার অভাব’ বলেই আখ্যা দেয়া হয়েছে।
৫২ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারপতি মো. খসরুজ্জামানের একক বেঞ্চ বলেন, দুই মাস চার দিনে ৪২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ এবং মাত্র আট দিনের মধ্যে রায় ঘোষণা একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য ইঙ্গিত’ দেয় যে, মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক নিয়ম ও সময়সীমা অনুসরণ করেনি। এতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়নি।
নোটিশ না দিয়েই সাজা: আইনি ব্যত্যয়
হাইকোর্টের মতে, ডা. জুবাইদা রহমানকে কোনো নোটিশ ইস্যু না করেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন ও সাজা দেয়া হয়, যা ‘দুদক আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’। আদালত বলেছে, অভিযোগ গঠনের সময় ফৌজদারি কার্যবিধির ২২১ ধারার বিধান অনুসরণ করা হয়নি, যা বিচার প্রক্রিয়াকে ত্রুটিপূর্ণ ও বাতিলযোগ্য করে তোলে।
সাক্ষীদের জবানবন্দিতে দুর্নীতির প্রমাণ নেই
আদালত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, ৪২ জন সাক্ষীর মধ্যে কেবল ১ ও ৪২ নম্বর সাক্ষী ছাড়া আর কেউই তারেক রহমান বা জুবাইদা রহমানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের কোনও প্রমাণ দেননি। এমনকি বাকিরা কেবল ‘জব্দ তালিকা’ সম্পর্কিত সাক্ষ্যই দিয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে।
আপিল না করেও খালাস
রায়ে হাইকোর্ট ব্যাখ্যা করেন, মামলার এতোসব আইনগত অসঙ্গতি থাকায় গোটা রায়ই বাতিলযোগ্য হয়ে পড়ে। তাই আপিল না করেও তারেক রহমান খালাসের সুবিধা পেয়েছেন। অন্যদিকে, ডা. জুবাইদা রহমানের তিন বছরের দণ্ডও বাতিল করা হয়।
‘দ্রুত সাজা দিতে বিচার চলেছে’: আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
আদালতে আপিলকারীদের পক্ষে থাকা আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আমরা বারবার বলেছিলাম, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত বিচার। আদালতের রায়ে এখন তা প্রমাণিত হলো। শুধু সাক্ষ্য দ্রুত নেয়া নয়, মোমবাতি জ্বালিয়েও সাজা দেয়া হয়েছে।
মামলার পটভূমি
২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর দুদক রাজধানীর কাফরুল থানায় মামলাটি করে, যার আসামি ছিলেন তারেক রহমান, ডা. জুবাইদা রহমান এবং তার মা সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু। অভিযোগ ছিলো— সম্পদের তথ্য গোপন এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন।
২০২৩ সালের ২ আগস্ট বিচারিক আদালত তারেক রহমানকে দুই ধারায় মোট নয় বছর ও জুবাইদা রহমানকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন। পাশাপাশি আর্থিক জরিমানাও করা হয়। পরে জুবাইদা রহমানের সাজা এক বছরের জন্য স্থগিত করে সরকার।
১৭ বছর লন্ডনে থাকার পর ২০২৫ সালের ৬ মে খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কারণে দেশে ফেরেন জুবাইদা রহমান। এরপর ১৩ মে হাইকোর্ট তার বিলম্বিত আপিল গ্রহণ করে শুনানির জন্য নেয়। শুনানি শেষে ২৮ মে তাদের দুজনকে খালাস দেন হাইকোর্ট।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইকোর্টের এ রায় শুধু তারেক-জুবাইদার খালাস নয়, বরং দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণও। এতে স্পষ্ট হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ও আইন উপেক্ষা করে দেয়া রায় আইনে টিকে থাকতে পারে না।
এ রায় একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নেও গুরুতর আলোড়ন তুলতে পারে, বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলাগুলোর বিচারিক মানদণ্ড ঘিরে।
সবার দেশ/কেএম




























