অস্থির সুইদা প্রদেশে সেনা মোতায়েন
সিরিয়ায় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ৮৯
সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় সুইদা প্রদেশ ফের রক্তাক্ত। দ্রুজ মিলিশিয়া ও সুন্নি বেদুইন উপজাতিদের মধ্যকার সংঘর্ষে দুই দিনের মধ্যে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ জনে। সোমবার (১৪ জুলাই) স্থানীয় পর্যবেক্ষক সংস্থার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপি এ তথ্য জানিয়েছে।
দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এ সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে ৪৬ জন দ্রুজ, ১৮ জন বেদুইন, ৪ জন বেসামরিক এবং ৭ জন অজ্ঞাতপরিচয় সামরিক পোশাকধারী ব্যক্তি রয়েছেন। এছাড়া সংঘাত নিয়ন্ত্রণে পাঠানো সরকারি বাহিনীর ছয় সদস্যও নিহত হয়েছেন বলে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
অপহরণ থেকেই উত্তপ্ত পরিস্থিতি
রোববার (১৩ জুলাই) রাজধানী দামেস্কে দ্রুজ সম্প্রদায়ের এক সবজি বিক্রেতা অপহরণ হওয়ার পর পাল্টা অপহরণের মাধ্যমে শুরু হয় উত্তেজনা। যদিও উভয় পক্ষের অপহৃতরা পরবর্তীতে মুক্তি পান, তারপরও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে সুইদা শহরের উপকণ্ঠে। শুরু হয় মর্টার ও কামানের গোলাবর্ষণ।
জনমানবশূন্য রাস্তায় চলেছে গোলাবর্ষণ
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সোয়াইদা২৪ জানিয়েছে, সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হয়ে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সুইদার রাস্তাঘাট জনমানবশূন্য, দোকানপাট বন্ধ, যান চলাচল বন্ধ। জানাজার সময়ও গুলির শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছেন একজন এএফপি আলোকচিত্রী।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু তাইম বলেন, আমরা চরম আতঙ্কে আছি। নির্বিচারে কামানের গোলা ছোড়া হচ্ছে। কোথাও নিরাপদ নয়।
রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতা
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনাস খাত্তাব এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া পোস্টে বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা কাঠামোর অনুপস্থিতিই এই উত্তেজনার মূল কারণ। এখন প্রয়োজন কাঠামোগত পুনর্গঠন।’
আসাদের পতনের পর নতুন সংকট
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর ইসলামপন্থী জোটের অন্তর্বর্তী নেতা আহমাদ আল-শারা ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু কয়েক দশকের গৃহযুদ্ধ আর রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে নতুন নেতৃত্ব এখনো স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ।
দ্রুজ-বেদুইন সংঘর্ষ: পুরনো দ্বন্দ্ব, নতুন বিস্ফোরণ
সুইদা অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই দ্রুজ ও বেদুইনদের মধ্যে ভূসম্পত্তি, ক্ষমতা এবং নিরাপত্তা দায়িত্ব নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। গত মে মাসে এক চুক্তির মাধ্যমে এ অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব দ্রুজ যোদ্ধাদের ওপর দেয়া হলেও বহু এলাকায় এখনো সশস্ত্র বেদুইন যোদ্ধারা সক্রিয়।
পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘দ্য অবজারভেটরি’ জানিয়েছে, অতীতে এ বেদুইনদের একাংশ সরকারি বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিলেও বর্তমানে তারা অধিকাংশ এলাকায় নিজেদের শক্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ফলে সংঘর্ষ এড়ানো যাচ্ছে না।
ইসরায়েলের হস্তক্ষেপ ও দ্রুজ সংযোগ
সুইদা প্রদেশের দ্রুজ সম্প্রদায় ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু এবং শিয়া মত থেকে আলাদা একটি গোপন বিশ্বাসে বিশ্বাসী। তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ইসরায়েল ও লেবাননে বসবাস করে। ইসরায়েল দাবি করেছে, সম্প্রতি দ্রুজদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সিরিয়ার ভেতরে কয়েকটি সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এমনকি মে মাসে দামেস্কের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছাকাছিও হামলা চালানো হয়।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে
সিরিয়ায় ফের ঘনীভূত হওয়া সাম্প্রদায়িক সংঘাত দেশটির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা ও নতুন সরকারের ক্ষমতা ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। বিশেষত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করতে পারা ইসলামপন্থী সরকারের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসাদের পতনের পর যদিও এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিলো, কিন্তু পুরনো সংঘাত ও গভীর ধর্মীয় বিভাজন নতুন সরকারকে স্থিতিশীলতা এনে দিতে পারছে না। সুইদা এখন সিরিয়ার সাম্প্রদায়িক দুর্বলতার প্রতীক হয়ে উঠছে।
সূত্র: এএফপি।




























