চেয়েছিলো ১৫ হাজার ডলার
চাঁদা না পেয়ে ঢামেক চিকিৎসকের ওপর হামলা
চাঁদা চাওয়া হয়েছিলো ১৫ হাজার ডলার। ব্যবহার করা হয়েছিলো চট্টগ্রামের একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের নাম। প্রথমে বিষয়টিকে প্রতারক চক্রের ভুয়া বার্তা ভেবে গুরুত্ব দেননি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আসাদুর রহমান। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চাঁদা না দেয়ার পরই ঘটে ভয়াবহ হামলা।
রাস্তায় সিএনজি অটোরিকশা থামিয়ে চারজন দুর্বৃত্ত তার ওপর হামলা চালায়। রক্তাক্ত হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর একই নম্বর থেকে তার মোবাইলে আসে উপহাসমূলক বার্তা—‘হাউ ডু ইউ ফিল নাও’ (এখন কেমন লাগছে)! পরদিনও পাঠানো হয় আরও দুটি হুমকিবার্তা।
৫৫ বছর বয়সী অধ্যাপক ডা. আসাদুর রহমান বর্তমানে নিজের কর্মস্থল ঢামেক হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন। হামলায় তার ডান চোখে গুরুতর আঘাত লাগে। চোখটি লাল হয়ে ফুলে গেছে।
ভুক্তভোগী চিকিৎসক জানান, কয়েক দিন আগে তার মোবাইলে একটি বার্তা আসে। সেখানে চট্টগ্রামের একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের নাম ব্যবহার করে তার কাছে ১৫ হাজার ডলার চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা পরিশোধের জন্য ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিলো।
বিষয়টিকে প্রথমে কোনও প্রতারক চক্রের মিথ্যা বা ভয় দেখানোর চেষ্টা মনে করে তিনি গুরুত্ব দেননি। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার মাত্র দুই দিন পর, ১৭ আগস্ট রাতে হামলার শিকার হন তিনি।
সেদিন রাজধানীর পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিজের চেম্বারের কাজ শেষ করে সিএনজি অটোরিকশায় করে বাসায় ফিরছিলেন ডা. আসাদুর রহমান। অটোরিকশাটি শান্তিনগর এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ চার ব্যক্তি পথরোধ করে।
হামলাকারীরা সিএনজির দরজা খোলার জন্য জোরাজুরি করতে থাকে। চিকিৎসক তাদের বাধা দিলেও একপর্যায়ে চালক দরজা খুলে দেন। এরপর চারজন মিলে তাকে বেধড়ক মারধর শুরু করে।
মারধরের সময় হামলাকারীরা দাবি করে, চিকিৎসক তাদের একজনের বোনের ‘ভুল চিকিৎসা’ করেছেন। তবে ওই রোগীর পরিচয় জানতে চাইলে কিংবা চিকিৎসার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তারা কোনও সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি।
এ সময় আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে হামলাকারীদের একজনকে ধরে ফেলেন। পরে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। আটক ওই যুবকের বাড়ি চিকিৎসকের নিজ এলাকা লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে বলে জানা যায়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ওই যুবক দাবি করেছে, কেউ একজন তাকে প্রলোভন দেখিয়েছিলো। তাকে বলা হয়েছিলো, চিকিৎসকের অনেক টাকা রয়েছে এবং তাদের সঙ্গে গেলে তাকে একটি মুঠোফোন কিনে দেয়া হবে। তবে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রোগীর ভুল চিকিৎসার অভিযোগের বিষয়ে সে কিছুই বলতে পারেনি।
হামলার প্রায় এক ঘণ্টা পর ডা. আসাদুর রহমানের মোবাইলে একই নম্বর থেকে আবার বার্তা আসে। সেখানে লেখা ছিলো, ‘হাউ ডু ইউ ফিল নাও’। পরদিন একই নম্বর থেকে আরও দুটি বার্তা পাঠানো হয়। একটিতে বলা হয়,
তুমি কি আরও ঝামেলা করতে চাও?’ অন্যটিতে হুমকি দেয়া হয়, তোমার কাছে কি আমরা মিডিয়ার লোকজন পাঠাবো?
এ ঘটনায় পল্টন থানায় মামলা করেছেন অধ্যাপক ডা. আসাদুর রহমান। তবে মামলার এজাহারে ১৫ হাজার ডলার চাঁদা দাবির বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও, চাঁদার জন্য ডেভিড ইমনের নাম ব্যবহারের বিষয়টি এবং হামলার পর পাঠানো হুমকিবার্তার তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মামলার তদন্তের বিষয়ে পল্টন থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে পূর্বশত্রুতার জের বলে মনে হচ্ছে। হামলায় জড়িত অন্যদের গ্রেফতার করা গেলে ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য পরিষ্কার হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে আটক ‘জীবন’ নামের ওই যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হামলায় জড়িত আরও একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
তবে থানা-পুলিশের চলমান তদন্তে সন্তুষ্ট নন ভুক্তভোগী চিকিৎসক। ঘটনার পেছনে চাঁদাবাজি, পরিকল্পিত হামলা ও হুমকির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে মামলাটি দ্রুত গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের কাছে বিপুল অঙ্কের চাঁদা দাবি, নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর পরিকল্পিত হামলা এবং পরবর্তী সময়ে একই নম্বর থেকে ধারাবাহিক হুমকিবার্তা পাঠানোর ঘটনায় পুরো বিষয়টি ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। পুলিশ বলছে, হামলায় জড়িতদের গ্রেফতার করা গেলে ঘটনার নেপথ্যের কারণ ও পরিকল্পনাকারীদের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
সবার দেশ/কেএম




























