ফ্রান্সের নির্বাচনে শ্রমিক রাজনীতির নতুন প্রার্থী আনাস কা-জিব
ফ্রান্সের ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে অতিবাম রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন রেলকর্মী ও শ্রমিক সংগঠক আনাস কা-জিব , তিনি বামপন্থী ট্রটস্কিস্ট রাজনৈতিক সংগঠন ‘রেভ-ল্যুশিওঁ পার-মানাঁত’-এর হয়ে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
সোমবার ১ জুন প্রকাশিত তার নির্বাচনী ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, তিনি এমন একটি প্রার্থীতা সামনে আনতে চান যা সরাসরি শ্রমিক শ্রেণির অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম এবং দাবি থেকে উঠে আসে। তার ভাষায়, এটি হবে ‘একটি শ্রমিকভিত্তিক, কমিউনিস্ট এবং বিপ্লবী প্রার্থীতা’। এ ঘোষণার মাধ্যমে তিনি ফরাসি রাজনীতিতে প্রচলিত বামধারার দলগুলোর থেকে আলাদা অবস্থান তুলে ধরতে চেয়েছেন।
আনাস কা-জিব ৩৯ বছর বয়সী একজন রেলকর্মী এবং দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। তিনি ট্রেড ইউনিয়ন সু রেল বা সুদ রেল- এর সক্রিয় সদস্য। পাশাপাশি তিনি ফ্রান্সের সার্সেল এলাকার বাসিন্দা, যা অভিবাসী শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর জন্য পরিচিত একটি উপশহর।
শ্রমিক আন্দোলনের বাইরে তিনি একসময় ফরাসি গণমাধ্যমে পরিচিত মুখ ছিলেন। জনপ্রিয় টেলিভিশন ও রেডিও টক শো লে গ্রঁদ গ্যুল-এ তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন, যেখানে সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে তিনি স্পষ্ট ও বিতর্কিত মতামত দিতেন।
রাজনৈতিকভাবে কাসিব নিজেকে বর্ণবাদবিরোধী, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং ডিকলোনিয়াল বা উপনিবেশবাদ-বিরোধী চিন্তাধারা’র সমর্থক হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি ফরাসি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে শ্রমিক ও অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছেন।
তবে তার রাজনৈতিক অবস্থান বিতর্কের বাইরে নয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর তিনি ফিলিস্তিনি ‘প্রতিরোধকে সমর্থন’ জানিয়ে বক্তব্য দেন। এ অবস্থানের কারণে তার বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের’ অভিযোগ আনা হয় এবং বর্তমানে তার বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া চলমান। আগামী ২৫ জুন তার মামলার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক দমননীতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং দাবি করেছেন যে এটি শ্রমিক ও সামাজিক আন্দোলনকে দুর্বল করার একটি প্রচেষ্টা।
আনাস কাসিব ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথমবার প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে ফ্রান্সের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ১৬০ জন নির্বাচিত মেয়রের পারঁনাজ বা সমর্থন সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। এবার তার সংগঠন দাবি করছে যে পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভিন্ন। রেভল্যুশিওঁ পারমানঁত জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে বহু স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধির সমর্থন অর্জন করেছে এবং দেশজুড়ে প্রচারণা জোরদার করছে।
এ সংগঠনটি ২০২২ সালে নুভো পার্তি অঁতি-ক্যাপিতালিস্ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গঠিত হয়। দলটি মনে করে, আগের সংগঠন লা ফ্রঁস আনসুমিজ-এর সঙ্গে অতিরিক্ত রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা শ্রমিক আন্দোলনের স্বাধীন চরিত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ফ্রান্সের অতিবাম রাজনীতিতে ইতোমধ্যে আরেকজন পরিচিত প্রার্থী হিসেবে আছেন নাতালি আর্তো; যিনি লুত ওভ্রিয়ে -এর প্রতিনিধিত্ব করেন। দীর্ঘদিন ধরে এই দুই ট্রটস্কিস্ট ধারার মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য ও কৌশলগত বিভাজন বিদ্যমান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফরাসি বাম রাজনীতিতে জঁ-লুক মেলঁশোঁ-এর উত্থানের পর অতিবাম ভোটব্যাংক আরও ছোট ও বিভক্ত হয়ে গেছে। ফলে ছোট বিপ্লবী দলগুলোর জন্য জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে আনাস কাসিবের এ প্রার্থীতা ফরাসি রাজনীতিতে শ্রমিক শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব, অভিবাসী রাজনীতি এবং অতিবাম আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তার প্রচারণা একদিকে যেমন সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনের কণ্ঠস্বর হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি এটি ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিসরে সীমিত প্রভাবসম্পন্ন অতিবাম ধারার পুনরায় সংগঠিত হওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সবার দেশ/কেএম




























