মে দিবসে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ, ছুটি বাতিল বিতর্কে উত্তাল রাজপথ
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে ফ্রান্সজুড়ে এবার দেখা গেছে ব্যাপক বিক্ষোভ, রাজনৈতিক উত্তাপ এবং শ্রমিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। ১ মে ঘিরে আয়োজিত দেশব্যাপী মিছিল ও সমাবেশে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে কার্যত উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথ।
শ্রমিকদের প্রধান দাবি ছিলো—মে দিবসের সরকারি ছুটি ও কর্মবিরতির মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা, মজুরি বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসেই ছিলেন প্রায় ২৪ হাজার মানুষ। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিলো ৩ লাখের বেশি এবং শুধু প্যারিসেই সমবেত হয়েছিলেন প্রায় ১ লাখ বিক্ষোভকারী।
এবারের আন্দোলনের বড় ইস্যু হয়ে ওঠে ১ মে ছুটির দিনে বেকারি, ফুলের দোকানসহ কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার সরকারি পরিকল্পনা। শ্রমিক সংগঠন ও বামপন্থী দলগুলো এ উদ্যোগকে শ্রমিক দিবসের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সরকার ধীরে ধীরে মে দিবসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব খর্ব করার চেষ্টা করছে।
বিতর্ক আরও তীব্র হয় যখন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ ল্যকর্নু প্রতীকীভাবে একটি বেকারি থেকে রুটি কিনে এ উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানান। বিরোধীরা এটিকে ‘রাজনৈতিক নাটক’ ও ‘শ্রমিকবিরোধী বার্তা’ হিসেবে সমালোচনা করে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোঁরা নুনিয়েজ জানিয়েছেন, অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও কিছু এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দেশজুড়ে অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭ জন প্যারিসের।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও মে দিবসের বিক্ষোভ নতুন মাত্রা পেয়েছে। বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ প্যারিসের সমাবেশে শ্রমিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দেন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, তার রাজনৈতিক জোট ইতোমধ্যেই ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে।
অন্যদিকে ডানপন্থী নেতা জর্দান বার্দেলা ‘যোগ্যতার ভিত্তিতে সমাজ’ গঠনের কথা তুলে ধরে বলেন, কেউ চাইলে ১ মে কাজ করতে পারবে এবং এর বিনিময়ে দ্বিগুণ মজুরি পাওয়া উচিত। তার এ বক্তব্য শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সমাজতান্ত্রিক নেতা অলিভিয়ে ফোর বিক্ষোভে অংশ নিতে গিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন। তাকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন স্লোগান দেয়া হয়, যা ফরাসি বাম রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
ফ্রান্সের অন্যতম শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠন সিজিটির প্রধান সোফি বিনে বলেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শ্রমিকদের প্রকৃত আয় রক্ষা করা। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বাড়াতে হবে। তিনি ন্যূনতম মজুরি কমপক্ষে ৫ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি জানান।
শুধু ফ্রান্স নয়, বিশ্বের ১৬৭টি দেশেই এবারের মে দিবস নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে শ্রমিকরা যুদ্ধবিরোধী অবস্থান, বৈষম্য এবং শ্রম অধিকার নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন। ফলে এবারের মে দিবস বৈশ্বিক শ্রমিক সংহতি ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের একটি বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সে শ্রমিক আন্দোলন, মূল্যস্ফীতি, সামাজিক অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ এখন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এসব ইস্যু আগামী দিনগুলোতে ফরাসি রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
সবার দেশ/কেএম




























