Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০০:০৫, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

পুরাতন গ্লানি মুছে নবজাগরণের আহ্বান

এসো হে বৈশাখ, এসো...

এসো হে বৈশাখ, এসো...
প্রতীকি ছবি

বিদায় চৈত্র, স্বাগত বৈশাখ। বাংলা বছরের প্রথম দিনটি শুধু একটি নতুন তারিখের সূচনা নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক মহামিলন। পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব, যেখানে পুরোনো জীর্ণতা, গ্লানি ও হতাশা বিদায় নিয়ে নতুন আশার আলোয় শুরু হয় নতুন পথচলা।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় বৈশাখকে স্বাগত জানিয়েছেন নবসৃষ্টির ঝড়ো আহ্বানে—

‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়।’

এ আহ্বানে আছে পুনর্জাগরণের ডাক। বৈশাখ আসে ঝড়ের বেগে, ধুলোমলিন প্রকৃতিকে ধুয়ে-মুছে নির্মল করে, তেমনি মানুষের মন থেকেও মুছে দিতে চায় পুরোনো ক্লান্তি। নতুন বছর তাই কেবল উৎসব নয়, এটি নতুন করে বাঁচার অঙ্গীকার।

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে মুঘল সম্রাট আকবর রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করেন। হিজরি চান্দ্রবর্ষ অনুযায়ী কর আদায়ে কৃষকদের সমস্যা হচ্ছিলো, কারণ কৃষিকাজ চলে সৌরবর্ষের হিসাবে। সে জটিলতা দূর করতে জ্যোতির্বিদ আমীর ফতুল্লাহ শিরাজীর সহায়তায় প্রবর্তিত হয় বাংলা সন। তখন থেকেই বৈশাখ বাংলা বছরের প্রথম মাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলা সনের সঙ্গে ৫৯৩ যোগ করলে পাওয়া যায় গ্রেগরিয়ান সাল—এ হিসাব আজও প্রচলিত।

একসময় বৈশাখ মানেই ছিলো গ্রামবাংলার খোলা মাঠে প্রাণের মেলা। নাগরদোলা, পুতুলনাচ, সাপের খেলা, মাটির খেলনা, পাতার বাঁশি, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা, মোয়া, খাজা—এসব ছিলো বৈশাখী আনন্দের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিশু-কিশোরদের হাসি, লোকজ সংগীতের সুর আর গ্রামীণ মানুষের মিলনমেলায় উৎসব হয়ে উঠত প্রাণবন্ত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সে চিত্র। এখন অনেক মেলাই বাণিজ্যিকতা ও অশ্লীলতার প্রভাবে হারাচ্ছে ঐতিহ্য। ফলে নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে শিকড় থেকে।

রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ বৈশাখকে দেখেছেন সংগ্রাম ও শক্তির প্রতীক হিসেবে—

‘সকল দীনতা ক্লেদ লুপ্ত করা, জড়তার চিহ্ন মুছে যাক;
বিজয়ী বীরের মত নির্ভীক সেনানী তুমি
এস ফিরে হে দৃপ্ত বৈশাখ॥’

এ আহ্বানে ফুটে ওঠে এক নতুন সমাজের স্বপ্ন—যেখানে ভীরুতা নয়, সাহস হবে পথচলার শক্তি। বৈশাখ আমাদের শেখায়, পুরোনো ব্যর্থতা পেছনে ফেলে নতুন উদ্যমে সামনে এগোতে।

বাংলা নববর্ষের মূল চেতনা হলো শুদ্ধি, সাম্য ও মানবিকতা। আজকের সমাজে যখন দুর্নীতি, অবিচার, বৈষম্য ও সহিংসতা বেড়েই চলেছে, তখন বৈশাখ আমাদের সামনে তুলে ধরে আত্মসমালোচনার সুযোগ। এ দিনে প্রয়োজন নিজেদের জিজ্ঞেস করা—আমরা কি সত্যিই নতুন বছরে নতুন মূল্যবোধ গ্রহণ করছি?

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার অমর গানে বৈশাখকে আহ্বান জানিয়েছেন শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে—

‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।
তাপসনিঃশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥’

এ গান শুধু ঋতুর আহ্বান নয়; এটি সমাজ থেকে অন্যায়, অনাচার, গ্লানি ও জরা দূর করার ডাক। আজ যখন সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয়, শিশু নির্যাতন, দুর্নীতি ও অসহিষ্ণুতা বেড়েছে, তখন বৈশাখের প্রকৃত তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে।

নতুন প্রজন্মকে বাংলা নববর্ষের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও দর্শনের সঙ্গে পরিচিত করানো এখন সময়ের দাবি। কেবল বৈশাখের আনন্দ শোভাযাত্রা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, তাদের জানতে হবে কেনো এ উৎসব আমাদের অস্তিত্বের অংশ। বৈশাখ মানে শুধু রঙিন পোশাক নয়—এটি শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা।

নতুন বছর আমাদের প্রত্যাশা—দেশ হোক দুর্নীতিমুক্ত, সমাজ হোক মানবিক, শিশুদের জন্য নিরাপদ, আর মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর হোক। বৈশাখের অগ্নিস্নানে পুড়ে যাক সব গ্লানি, সব অন্ধকার।

এসো হে বৈশাখ, নতুন আলোয় জাগাও বাংলাদেশ।

লেখক ও সংবাদকর্মী

শীর্ষ সংবাদ:

ব্যাংকিং খাতে ‘লুটেরাদের পুনর্বাসন’ হচ্ছে: টিআইবি
ইরানি বেসামরিকদের হুমকি দিয়ে ট্রাম্প ভুল করেছেন
বিএনএসবির কমিটি ভেঙে নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা এমপির
ইরানকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে ট্রাম্পকে কড়া বার্তা চীনের
পুলিশ সংস্কারে কমিশন গঠনের পথে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
নববর্ষের শুভেচ্ছায় ঐক্যের আহ্বান জামায়াত আমিরের
শার্শায় ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা: অভিযুক্ত বৃদ্ধ আটক
পাম্পে সিরিয়াল নিয়ে যশোরে যুবদল-ছাত্রদল সংঘর্ষ, আহত ১০
বিসিবিতে কে এলো, কে গেলো—মাথাব্যথা নেই সাকিবের
প্রকৌশলীকে বাঁশ দিয়ে দৌঁড়ানি দিলেন ঠিকাদারের গাড়িচালক
এক মুরগী ৩ বার জবাই চলবে না—যশোরে শিক্ষামন্ত্রী
পহেলা বৈশাখে বেনাপোলে আমদানি-রফতানি বন্ধ
নববর্ষে ঐক্য, সংস্কৃতি ও নতুন অঙ্গীকারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
হামে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু, ঢাকায় সর্বোচ্চ সংক্রমণ
সংসদে ফ্যাসিবাদের ছায়া ফিরেছে: জামায়াত আমির