কান্দিস না আমার দায়
যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়
এমন একটা সময় ছিলো যে, গলার স্বর শুনে আমরা বলে দিতে পারতাম কে খবর পড়ছে বা কে গান গাইছে। অর্থাৎ কন্ঠস্বর শুনে বলে দেয়া যেতো শিল্পীর নাম। সেটা টেলিভিশনে প্রচারিত কোন নাটক বা সিনেমা বা রেডিওতে খবর পাঠ। এমনকি দূরের মাইকে ভেসে আসা কোন গান।
এভাবে নাটক, সিনেমার অভিনেতা ও অভিনেত্রীর গলার স্বর আমাদের কাছে পরিচিত ছিলো। সে সাথে পরিচিত ছিলো বিজ্ঞাপনে যারা ভয়েস দিতেন। বেতারের ঘোষক ঘোষিকাদের কথা নাইবা বললাম। শুনে শুনে আমাদের কান দুটি চোখের কাজ করতো। এমনকি চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারতাম কে কথা বলছে।
বাবা সরকারী চাকুরে ছিলেন সে কারণে দুই তিন বছর পর পর বদলি হতেন। আর বদলি মানেই বিদায়ী অনুষ্ঠান আর সে অনুষ্ঠানে উপহার দেয়ার প্রচলন ছিলো। সে ফেয়ার ওয়েল অনুষ্ঠান থেকে বাবাকে একটা রেডিও দেয়া হয়, আমার যতদূর মনে পড়ে বাগেরহাটের হোমিওপ্যাথি কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয় সেটা দিয়েছিলেন।
সত্তর দশকের শেষ দিকের কথা। আমরা মহকুমায় থেকেছি ছোট শহর সবাই কম বেশি সবাইকে চিনতো। যখন রেডিও আমাদের বাসায় এলো তখন থেকেই আমাদের বাসায় গানের আগমন ঘটলো। মূলত বাবা খবর শুনতেন আর আমরা বিনোদনের জন্য রেডিও শুনতাম, আম্মা শুনতেন নাটক। আসলে এ গল্প আমাদের বয়েসের সবার কাছে ছিলো এক সাধারণ গল্প।
আমাদের সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মতো ভালো ছিলো না। তখন এক শহর থেকে আরেক শহরে খবরের কাগজ যেতে যেতে একদিন লেগে যেতো। এতো টিভি চ্যানেল, অনলাইন পত্রিকা, ইন্টারনেট ছিলো না। প্রচার মাধ্যম বলতে অনেক পত্রিকা, রেডিও আর বাংলাদেশ টেলিভিশন। এমনকি সিনেমা ভিত্তিক যে পত্রিকা প্রকাশ হতো, সব বাড়িতে সেসব পত্রিকা রাখাও হতো না। টেলিভিশন সবার ক্রয় সীমার ভেতরে ছিলোনা। ফলে রেডিও ছিলো একমাত্র সহজ যোগাযোগের ও বিনোদনের মাধ্যম। কেউ যদি ধূপ জ্বেলে দেয় তাহলে এর সুবাস সারা ঘর জুড়ে মৌ মৌ করে। তিনি এ গানের মাধ্যমে আমাদের জীবনে ধুপ হয়ে এসেছিলেন সুবাস ছড়াতে। গেলো ৭ এপ্রিল আমাদের অনেকেরই প্রিয় শিল্পী প্রয়াত সুবীর নন্দীর ৭ম মৃত্যু বার্ষিকী।
সে কথা নয়নে আগুন-আলপনা আঁকে
সুবীর নন্দী ছিলেন একজন বাংলাদেশী সুনামধন্য জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী। তার জন্ম হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানায় নন্দী পাড়া নামক মহল্লায় এক সম্ভ্রান্ত সঙ্গীত পরিবারে। তার পিতা তেলিয়াপাড়া চা এস্টেটের চিকিৎসক ছিলেন। এ তেলিয়াপাড়া চা বাগানে ছাত্রাবস্থায় অনেকবার গিয়েছি ঘুরতে আর কানে ভেসে আসতো ‘সে কথা নয়নে আগুন-আলপনা আঁকে সেখানে/ স্মৃতির পাপিয়া চোখ গেলো বলে ডাকে’। এসব গান শুনে মনে হতো এ সবুজ ছায়ায় তিনি কোথাও আছেন, গুণ গুণ করে খান আতার এ গান গাইছেন।
ছোটবেলা থেকেই অন্য নয় ভাইবোনের সঙ্গে ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নিতেন তিনি। তবে সঙ্গীতে তার হাতেখড়ি ঘটে মায়ের কাছেই। খুবই চমৎকার গান করতেন তার মা, কিন্তু পেশাদারী সঙ্গীতে আসেননি। সঙ্গীত জীবন বাংলাদেশের আধুনিক সঙ্গীতের অবিস্মরণীয় এ কণ্ঠশিল্পী, আধুনিক গানের পাশাপাশি কণ্ঠ দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় প্লেব্যাকে। তার গাওয়া অনেক আধুনিক গান পরে চলচ্চিত্রে সংযোজিত হয়েছে। তার গাওয়া গান এদেশে জনপ্রিয়তার আলাদা বলয় তৈরী করেছিল যা এখনো চলমান।
কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো
তিনি রেডিও, টিভি এবং মঞ্চে নিয়মিতভাবে গান করেছেন। বেশ কিছু সঙ্গীতভিত্তিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনার পাশাপাশি একটি রিয়েলিটি শো’র প্রধান বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন। সুরকার হিসেবে বেশ কিছু গান বেঁধেছেন নিজের জন্য। আবার অনেকেই তার সুরে গান করেছেন। বয়সের সীমারেখা পেরিয়ে আধুনিক সঙ্গীতের পাশাপাশি তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, ভজন, কীর্তন এবং পল্লীগীতিতেও যথেষ্ট পারঙ্গম ছিলেন।
আরও পড়ুন <<>> উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তি এবং মানবিকতার সমন্বয়
১৯৮৫ সালে মারাত্মক অ্যাকশন চলচ্চিত্র ‘উছিলা’-তে তিনি একটা গান করেছিলেন ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো’—যা সারা দেশ জুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিলো। সে সময় বিটিভিতে ছায়াছন্দ অনুষ্ঠানে এ গান দেখানো হয়েছে অনেকবার। দর্শকদের অনুরোধ আসতো রেডিওতে প্রচার করার জন্য। এইভাবেই তাকে ভালো বেসেছিলাম কত আপন করে আমরা অনেকেই সে কথা জানিনা।
হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে
একজন প্রিয় শিল্পীকে নিয়ে লিখছি, যিনি আর আমাদের মাঝে নেই। যদিও তার সঙ্গে আমি কাজ করিনি। তার গান সরাসরি দেখেছি কিছু অনুষ্ঠানে টিকেট কিনে আবার কখনও বিনা টিকেটে। আমাদের দেখা হলেও আলাপ হয়নি কোনওদিন কোথাও কথাও হয়নি। আমাদের কোনও সম্পর্কও নেই এ কথাটা অবশ্য বলা যায় না। আমাদের একটা সুসর্ম্পক আছে, সেটা যদিও একতরফা। সর্ম্পকটা হলো আমি তার গানের ভক্ত। আমরা তার গানের ভক্ত এবং আমরা তার গানের শ্রোতা। পেশাগতভাবে তিনি ব্যাংকে সুদীর্ঘ সময় চাকরি করেছেন। সেদিক থেকে অবশ্যা আমার সঙ্গে তার মিল আছে। উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে, বন্ধু হতে চেয়ে তোমার, আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি, এক যে ছিলো সোনার কন্যা, দিন যায় কথা থাকে প্রভৃতি। তিনি তার গানের স্বীকৃতি স্বরূপ পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। কোন একদিন, ৭ মে ২০১৯ সালে হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। যার উত্তর আমাদের কারো কাছেই নেই।
ভালোবাসা কখনো মরে না
এরপর ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকায় রেডিওতে লাইভ অনুষ্ঠানে গান করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে রেডিওতে এবং ১৯৭৪ সালে তিনি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক সিংগার হিসেবে গান গাওয়া শুরু করেন। আধুনিক ও চলচ্চিত্রের মোট গানের সংখ্যা আনুমানিক আড়াই হাজারের মতো হবে বা তারও কিছু বেশি। প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান আলমগীর কবির পরিচালিত ‘মহানায়ক’ ছবিতে গান গেয়ে। এরপর তিনি ‘শুভদা’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘মেঘের পর মেঘ’ ও ‘মহুয়া সুন্দরী’ ছবির সুবাদে এ সম্মাননা অর্জন করেন। দুঃখের পর সুখ, প্রেম বলে কিছু নেই, ভালোবাসা কখনো মরে না, সুরের ভুবনে, গানের সুরে আমায় পাবে শীর্ষক অ্যালবাম আছে তার। একটা সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বাঘা বাঘা নায়কেরা তার গানে ঠোঁট মিলিয়েছেন। ‘ভালোবাসা কখনো মরে না’ এ গানের মতো তার প্রতি আমাদের ভালোবাসা যেনো না মরে যায়। তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তার কর্মকান্ড নিয়ে কাজ করে যেতে হবে।
আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই
তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য গান এর শিরোনাম লিখে শেষ করা যাবে না। কোনটা ভালো আর কোনটা ভালো না সে বিচার করা খুব মুশকিল। তবে তার অনেক গান টিকে যাবে। অনাদিকাল ধরে মানুষ শুনবে সে সকল গান। তার বিখ্যাত কিছু গানের মধ্যে রয়েছে- আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়, নেশার লাটিম ঝিম ধরেছে, বন্ধু হতে চেয়ে তোমার, আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি, দিন যায় কথা থাকে, মাস্টারসাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই, বন্ধু তোর বারাত নিয়ে আমি যাবো, হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে, তুমি এমনই জাল পেতেছো সংসারে, পাহাড়ের কান্না দেখে, পাখীরে তুই, বন্ধু হতে চেয়ে তোমার, কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো, ও আমার উড়াল পংখীরে, মরিলে কান্দিস না আমার দায়, একটা ছিলো সোনার কন্যা, কেনো ভালোবাসা হারিয়ে যায়, তোমারি পরশে জীবন আমার ইত্যাদি। ৫০ বছর ধরে তিনি নিজস্ব একটা ধারা তৈরি করে, শুদ্ধ সংগীত চর্চা করে আমাদের আনন্দ দিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন। আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই এ গানটির কথার মতো মনে হয় এত সহজ কী করে গান গাওয়া যায় ইস যদি শিখতে পারতাম, আমরা। আফসোস থেকেই যায় অনেকের।
আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়
ইদানীং মৃত্যুর খবর শুনে আমার চিন্তার রেখা আরো লম্বা হয়, ভাবতে থাকি, এ ক্ষতি কীভাবে পূরণ করবো। প্রতি বছর আমরা আমাদের সংস্কৃতির অনেক গুণীজনকে হারিয়েছি। আরো কিছু গুণী বর্তমানে অসুস্থ। এদের সর্ম্পকে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কিভাবে জানবে? এ ধরনের গুণীজনদের আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হলে দরকার গবেষণা, পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা, শিল্পের প্রতি অগাধ ভালোবাসা যাতে করে একটি বইয়ে বা এমন কোনও স্থান যেখানে প্রতিটি শিল্পীর রেখে যাওয়া শিল্পকর্ম নিয়ে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তাদেরকে সম্মৃদ্ধ করতে পারে।
আমাদের দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাজের গতিবেগ বৃদ্ধির পাশাপাশি আরো নতুনভাবে এ ভাবে চলে যাওয়া শিল্পীদেরকে নিয়ে আরো কাজের সুযোগ রয়েছে বলে ধারণা করায় যায়। গুণী শিল্পী সুবীর নন্দীর গানের কথার মত আমি গবেষণায় নাম দস্তখত শিখতে চাই, যাতে আমাদের সংস্কৃতি দিন দিন আরো সম্মৃদ্ধ হয়। এ শিল্পীর মতো শিল্পীরা যুগে যুগে আসে। একবার এক সাক্ষাৎকারে মান্না দে বলেছিলেন , আরেকটা মান্না দে-এর জন্ম দিতে ভারতকে সত্তর বছর অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের ছোট দেশ কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। আমরা চাই তার মতো আরো শিল্পীর জন্ম হোক। আমরা পারি না কিছু সুযোগ তৈরি করতে? একথা যখন চিন্তা করি, তখন নেশার লাটিমের মতন আমি ঝিম ধরে বসে থাকি কিয়ৎক্ষণ। আমার চোখ দুটি তো আর পাথর নয় যে সে ভিজবে না। তাইতো ভিজে যায় বারে বার। স্মরণ করছি শ্রদ্ধাভরে তাকে।
মরিলে কান্দিস না আমার দায়
সম্প্রতি আমাদের দেশের এক বরেণ্য অভিনেতা, পরিচালক এর ৬০তম জন্মদিন পালিত হলো। আয়োজনটি নিয়ে নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, আমরা এটাই প্রত্যাশা করবো যে শুধু ব্যক্তি নয়, ব্যক্তির জন্মদিন নয়, আমরা চেষ্টা করবো তাদের কাজগুলোকে এ রকম একটা আলোচনার টেবিলে হাজির করা, যাতে আমরা কনটেন্টটা দেখতে পাই। শুধু ফর্ম না, কনটেন্টও দেখতে পাই।
আমরা আমাদের দেশের শিল্প, সাহিত্য নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের পাশাপাশি পেশাগতভাবে যারা সমাজের জন্য দেশের জন্য কাজ করেছেন তাদের পিছে না লেগে, কীভাবে তাদেরকে সম্মানিত করবো সে চিন্তা করি। ফলে ধীরে ধীরে একটা সুস্থ জাতির জন্ম হবে। এ দায় আমাদের, আমাদের সন্তান বড় হবে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে তারা অবদান রাখবে, সমাজের প্রতিটি কাজে তারা এগিয়ে আসবে। শুধু যারা মারা যাবে তার জন্য দায় থেকে আমরা কান্নাকাটি না করে বরং তাদের জীবন চরিত্র নিয়ে আলোচনা করবো, তাদের কাজ নিয়ে আলোচনা করবো এ হোক আমাদের প্রত্যাশা।
রাষ্ট্রের উপরে ছেড়ে না দিয়ে হোক না উদ্যোগ ব্যক্তি পর্যায়ে। আরো বেশি বেশি করে পত্রিকায় লেখা হোক, বের হোক ক্রোড়পত্র, টিভি চ্যানেলে হোক নানা ধরণের অনুষ্ঠান। এর ফলে আমাদের যারা ছেড়ে চলে গেছেন তারা যেনো আমাদের মেকি কান্না দেখে না বলেন ‘কান্দিস না আমার দায়’। আমাদের শিল্প ও শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখার দায় আমার আপনার সকলের।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও ব্যাংকার




























