Sobar Desh | সবার দেশ ফৌজিয়া রুবি

প্রকাশিত: ১৫:০৮, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার অগ্রপথিক ফজলুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার অগ্রপথিক ফজলুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী আজ
ছবি: সংগৃহীত

শিশুদের জন্য আলাদা চলচ্চিত্র নির্মাণের ভাবনা যখন বাংলা চলচ্চিত্রে তেমন প্রতিষ্ঠিত ছিলো না, তখনই শিশুদের উপযোগী চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন ফজলুল হক। তার বিশ্বাস ছিলো, শিশুরাই ভবিষ্যতের পৃথিবী গড়বে; তাদের কল্পনা, মনন ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে চলচ্চিত্র হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সে দূরদর্শী চিন্তা থেকেই তিনি নির্মাণ করেন শিশুতোষ চলচ্চিত্র প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে ১৯৫০ সালে ‘সিনেমা’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে সূচনা করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্রবিষয়ক সাংবাদিকতার এক নতুন অধ্যায়।

আজ ২৬ অক্টোবর এ গুণী চলচ্চিত্র পরিচালক, সাংবাদিক ও সম্পাদক ফজলুল হকের প্রয়াণ দিবস। ১৯৯০ সালের এই দিনে কোলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার জীবন ও কর্ম স্মরণ করিয়ে দেয়, একজন দূরদর্শী মানুষ শুধু নিজের সময়কে সমৃদ্ধ করেন না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও রেখে যান নতুন পথের দিশা। 

শিশুদের জন্য চলচ্চিত্র: সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক স্বপ্ন...

১৯৩০ সালের ২৬ মে বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন ফজলুল হক। চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, সাংবাদিক ও সম্পাদকসহ বিভিন্ন পরিচয়ে তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। তার কর্মজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিলো প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার সাহস। 

ষাটের দশকে নির্মিত তার শিশুতোষ চলচ্চিত্র প্রেসিডেন্ট বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের শিশু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। চলচ্চিত্রটি সান অব পাকিস্তান নামেও পরিচিত ছিলো। শিশুদের কেন্দ্র করে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের এ উদ্যোগ প্রমাণ করে, শিশুদের শুধু বিনোদনের দর্শক হিসেবে নয়, চলচ্চিত্রের কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবেও দেখা সম্ভব। তার ছেলে ফরিদুর রেজা সাগর এ চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন। 

ফজলুল হকের এ ভাবনা আজও প্রাসঙ্গিক। শিশুদের জন্য চলচ্চিত্র মানে কেবল রূপকথা কিংবা হাসি-আনন্দ নয়; বরং তাদের কল্পনাশক্তি, নৈতিক বোধ, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অথচ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে মানসম্মত শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারাবাহিকতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

‘সিনেমা’: চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অগ্রণী উদ্যোগ...

১৯৫০ সালে বগুড়া থেকে ফজলুল হকের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা ‘সিনেমা’। সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্রশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের পথ ছিলো সীমিত। এমন প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্র নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি, আলোচনা ও সমালোচনার ক্ষেত্র তৈরি করা ছিলো একটি সাহসী উদ্যোগ। পরে পত্রিকাটি ঢাকায় প্রকাশিত হয় এবং ১৯৫৯ সালের শেষ দিকে এর প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। 

‘সিনেমা’ শুধু একটি পত্রিকা ছিলো না; এটি চলচ্চিত্রকে শিল্প, সংস্কৃতি ও আলোচনার বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টার অংশ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার বিকাশে ফজলুল হকের এ উদ্যোগ তাই বিশেষভাবে স্মরণীয়।

মুক্তিযুদ্ধ, বেতার ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক উদ্যোগ

ফজলুল হকের কর্মপরিধি চলচ্চিত্র ও সাংবাদিকতায় সীমাবদ্ধ ছিলো না। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সংগঠক হিসেবে ভূমিকা রাখেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে কথিকা লেখার পাশাপাশি কোলকাতার আকাশবাণীতে ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’ নামে নাটক রচনা ও পরিচালনা করেন। সেখানে ‘মণি হক’ নামেও বিভিন্ন অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন তিনি। 

বাংলা ভাষার ব্যবহার বিস্তৃত করার ভাবনা থেকেও তিনি উদ্যোগী হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে ঘড়ির ডায়ালে বাংলা অঙ্কে সময় দেখানোর ‘বাংলা ঘড়ি’ চালু করেন। ১৯৭৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পায় তার পরিচালিত চলচ্চিত্র উত্তরণ, যার চিত্রনাট্য লেখার কাজ তিনি ১৯৬০ সালে ‘আজান’ নামে শুরু করেছিলেন। ১৯৭৬ সাল থেকে কোলকাতায় বসবাসকালে ‘চিত্রসারথী’ নামে আরও দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন; এর মধ্যে লোককাহিনিভিত্তিক সাতভাই চম্পা উল্লেখযোগ্য। 

ব্যক্তিজীবন ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার

ফজলুল হকের সহধর্মিণী ছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন। তাদের পরিবারও বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য ও গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। জ্যেষ্ঠ পুত্র ফরিদুর রেজা সাগর শিশুসাহিত্যিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব; তিনি চ্যানেল আই ও ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাদের মেয়ে কেকা ফেরদৌসী রন্ধনশিল্পী হিসেবে পরিচিত। ছোট ছেলে ফরহাদুর রেজা প্রবালও একসময় বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপস্থাপক ছিলেন। 

তবে ফজলুল হকের পরিচয়কে কেবল তার পরিবারের পরিচিতি দিয়ে মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়। তার প্রকৃত উত্তরাধিকার নিহিত রয়েছে নিজের সময়ে নতুন ক্ষেত্র তৈরি করার সাহস, শিশুদের নিয়ে দূরদর্শী চিন্তা এবং চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার ভিত নির্মাণের মধ্যে।

কীভাবে স্মরণ করা উচিত ফজলুল হককে?

ফজলুল হককে স্মরণ করার উদ্যোগ শুধু মৃত্যুবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলে তার কাজের প্রতি যথার্থ সম্মান জানানো হবে না। তার চিন্তা ও অবদানকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ।

  • শিশুতোষ চলচ্চিত্র উৎসব: প্রতিবছর তার প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে শিশুদের উপযোগী চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও নির্মাণ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে।
  • চলচ্চিত্র সংরক্ষণ ও গবেষণা: তার নির্মিত চলচ্চিত্র, ‘সিনেমা’ পত্রিকার পুরোনো সংখ্যা, সাক্ষাৎকার, চিঠি ও অন্যান্য দলিল সংগ্রহ করে ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা জরুরি।
  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলচ্চিত্র পাঠ: স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তার জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী এবং চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার কর্মশালা আয়োজন করা যেতে পারে।
  • শিশু চলচ্চিত্র নির্মাণে অনুদান: নতুন নির্মাতাদের জন্য শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে বিশেষ অনুদান ও পাণ্ডুলিপি প্রতিযোগিতা চালু করা যেতে পারে।
  • স্মৃতি পুরস্কারের বিস্তৃতি: চলচ্চিত্র পরিচালনা ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি শিশুতোষ চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্র গবেষণা এবং নতুন প্রতিভা বিকাশে অবদানের জন্যও স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

উল্লেখ্য, ফজলুল হকের স্মৃতিকে ধরে রাখতে ২০০৪ সালে কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের উদ্যোগে ‘ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার’ প্রবর্তিত হয়। চলচ্চিত্র পরিচালনা ও চলচ্চিত্র সাংবাদিকতায় অবদানের স্বীকৃতি দিতে এ পুরস্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। 

স্মরণে শুধু নয়, চর্চায় বেঁচে থাকুন ফজলুল হক...

ফজলুল হকের জীবন আমাদের শেখায়, একটি নতুন ভাবনা থেকেই সাংস্কৃতিক ইতিহাসে পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। শিশুদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার স্বতন্ত্র ক্ষেত্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি এমন দুটি পথের সন্ধান দিয়েছিলেন, যেগুলোর গুরুত্ব আজও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

শিশুরা ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী, তাদের মনোজগৎকে সুন্দর, সংবেদনশীল ও মানবিক করে গড়ে তোলা একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব। ফজলুল হক সে দায়িত্বের গুরুত্ব অনেক আগেই উপলব্ধি করেছিলেন।

তাই তার প্রয়াণ দিবসে সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা হবে তার নির্মিত চলচ্চিত্র ও সম্পাদিত পত্রিকার ইতিহাস নতুন করে তুলে ধরা, শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্যোগী হওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নির্মাতা ও সাংবাদিকদের জন্য সুযোগ তৈরি করা।

মানুষকে সত্যিকার অর্থে স্মরণ করা মানে শুধু তার অতীতকে সম্মান জানানো নয়, তার অসমাপ্ত স্বপ্নকে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নেয়া।

লেখক: সাংবাদিক ও কবি

শীর্ষ সংবাদ:

ভ্যাকসিন কারখানা স্থাপনে জাপানের সহায়তা চান প্রধানমন্ত্রী
ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যে ভয়ের শঙ্কা: জামায়াত
‘প্রেমে পড়া বারণ’, জয়ার মায়াবী লুকে মুগ্ধ ভক্তরা
অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি ঠেকানো কঠিন: রেলমন্ত্রী
ক্রসফায়ার বক্তব্যে আইজিপির অপসারণ চায় এনসিপি
হামলায় বিপর্যস্ত সৌদি, বাতিল ৪ হাজারের বেশি ফ্লাইট
নতুন পে-স্কেল নিয়ে দুঃসংবাদ, বাড়ছে না ভাতা
ফুলবাড়ীর বউ মেলা, পুরুষের প্রবেশ নিষেধ
কবিয়াল সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন কুমিল্লার দুই কৃতী সন্তান
ভারত থেকে আমদানি করা চালে ক্যান্সারের ঝুঁকির বিষ
সংসদের নিম্নকক্ষ ৪, উচ্চকক্ষের মেয়াদ ৬ বছর করার প্রস্তাব
ফ্রান্সজুড়ে লাখো মানুষের বিক্ষোভ, সংঘর্ষে উত্তাল শহর
পিএসসির সদস্য হলেন জুলাইয়ে হাসিনার ছবি সরানো অধ্যাপক শামীমা
যশোরে শার্শায় দাদার বিরুদ্ধে নাতিকে ধর্ষণের অভিযোগ
ভবন থেকে পড়ে প্রেমিকের মৃত্যু, মডেলের ভিডিও ভাইরাল
মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াচ্ছে বাংলাদেশ
ঝড়ে বিপর্যস্ত উত্তর ইউরোপ, বিদ্যুৎহীন দেড় লাখের বেশি বাড়ি