Sobar Desh | সবার দেশ সবার দেশ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১:২৮, ১৫ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ০১:৩২, ১৫ আগস্ট ২০২৬

প্রথম জন্মদিনে অনুপস্থিত বেগম খালেদা জিয়া, স্মরণে দেশবাসী

প্রথম জন্মদিনে অনুপস্থিত বেগম খালেদা জিয়া, স্মরণে দেশবাসী
ছবি: সবার দেশ

আজ ১৫ আগস্ট। বিএনপির চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন। তার মৃত্যুর পর এবারই প্রথম জন্মদিন পালিত হচ্ছে তাকে ছাড়া। ফলে দিনটি বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের কাছে একই সঙ্গে স্মরণ, শোক ও শ্রদ্ধার দিন হয়ে উঠেছে।

দলীয়ভাবে আজ সারাদেশে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে বিএনপি। রাজধানীতে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে সকাল ১১টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দলীয় কার্যালয় অথবা মসজিদে তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেন। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন, বিএনপির সাংগঠনিক বিস্তার এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান। বিএনপি ও তার সমর্থকদের কাছে তিনি ‘দেশনেত্রী’ হিসেবেও পরিচিত।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পথচলা অবশ্য শুরু হয়েছিলো একজন সাধারণ গৃহবধূ হিসেবে। ১৯৮১ সালে স্বামী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দলের নেতা-কর্মীদের আহ্বানে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন। পরের বছর দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

এরপর ধীরে ধীরে দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন খালেদা জিয়া। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েক দফা সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। তার সময়ে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, অবকাঠামো ও প্রশাসনে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়। দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতিতেও তার সরকারের ভূমিকা ছিলো উল্লেখযোগ্য।

তবে তার রাজনৈতিক জীবন ছিলো নানা সংকট, আন্দোলন, মামলা, কারাবাস ও রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন সরকারবিরোধী আন্দোলনে তিনি বারবার রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একাধিকবার তাকে আটক ও কারাবন্দী করা হয়।

ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও খালেদা জিয়ার জীবনে বড় রাজনৈতিক ও পারিবারিক সংকট নেমে আসে। ২০০৭ সালে তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তাকে গ্রেফতার করে কারাবন্দী করা হয়। একই সময়ে তার বড় ছেলে তারেক রহমান, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান গ্রেফতার হন এবং নির্যাতনের শিকার হন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও খালেদা জিয়া ও বিএনপির সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক বিরোধ অব্যাহত থাকে। একপর্যায়ে দুর্নীতির মিথ্যা মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি কারাবন্দী ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে পরবর্তী সময়ে সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও তার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত ছিলো।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন রাষ্ট্রপতির আদেশে খালেদা জিয়া মুক্তি পান। এরপর তার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। দীর্ঘ বন্দিত্ব ও অসুস্থতার পর তিনি পরিবারের সদস্য, দলীয় নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পান।

তবে শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে গত ৩০ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৮০ বছর। তার মৃত্যুর পর ঢাকায় অনুষ্ঠিত জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ ঘটে। দলীয় নেতা-কর্মীর পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানান।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হয়েছে। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ধরনের বিজয় অর্জন করে। নির্বাচনের পর তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।

বিএনপির নেতা-কর্মীদের মতে, দীর্ঘ সময় দেশে না থেকেও দলকে সংগঠিত রাখা এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে তারেক রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার নেতৃত্বে বিএনপির নির্বাচনী বিজয়কে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখছেন দলটির নেতা-কর্মীরা।

খালেদা জিয়ার শৈশব ও শিক্ষাজীবন

খালেদা জিয়ার জন্ম তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদারের পরিবারে জন্ম নেয়া এ শিশুর ডাকনাম ছিলো ‘পুতুল’। শৈশবের প্রথম কয়েক বছর জলপাইগুড়িতে কাটানোর পর ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পরিবারটি দিনাজপুরে চলে আসে।

দিনাজপুরেই তার শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বড় অংশ কাটে। তিনি সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৬৩ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

১৯৬০ সালে তৎকালীন সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। পরবর্তী সময়ে স্বামীর কর্মস্থল সূত্রে পশ্চিম পাকিস্তানেও অবস্থান করেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বন্দিত্ব

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় খালেদা জিয়ার জীবনেও নেমে আসে কঠিন পরিস্থিতি। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযান শুরুর পর তার স্বামী মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন এবং মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সে সময় খালেদা জিয়া দুই সন্তানকে নিয়ে চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন।

পরবর্তীতে তিনি ঢাকায় এসে আত্মগোপনে থাকেন। ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে দুই সন্তানসহ আটক করে। দীর্ঘদিন বন্দী থাকার পর ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিনে তিনি মুক্তি পান।

বিএনপির ভাষ্য, রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া বহুবার রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। কারাবাস, মামলা, রাজনৈতিক চাপ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দলীয় নেতৃত্ব ধরে রেখেছেন।

দেশনেত্রীর জন্মদিনে বিএনপির কর্মসূচি

খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে আজ সারাদেশে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে বিএনপি। গতকাল শুক্রবার দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৫ আগস্ট শনিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয় ও মসজিদে খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে সকাল ১১টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে।

দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের যথাযোগ্য মর্যাদায় এসব কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি।

রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ পথচলা, গণতন্ত্রের আন্দোলনে তার ভূমিকা এবং বিএনপির নেতৃত্বে তার অবদান নিয়ে আজ দিনভর স্মরণসভা, আলোচনা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হচ্ছে। জনসম্মুখে না থাকলেও তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও স্মৃতি ঘিরে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে আবেগ ও শ্রদ্ধা অব্যাহত রয়েছে।

সবার দেশ/কেএম

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিচারিক অবিচারের দীর্ঘ অধ্যায়
প্রথম জন্মদিনে অনুপস্থিত বেগম খালেদা জিয়া, স্মরণে দেশবাসী
ইতালিতে স্বপ্নের সংসারে নৃশংস পরিণতি, স্ত্রী-কন্যাসহ বাবুলের দাফন
উত্তরায় পেট্রোল পাম্পে ডাকাতির ঘটনায় গ্রেফতার ৫
জাতীয় প্রেসক্লাবে জমকালো কাওয়ালী সন্ধ্যা
সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেয়াও কঠিন হয়ে যাবে: বিদ্যুৎমন্ত্রী
তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত: রণধীর জয়সোয়াল
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ছাড়া সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেবো না: নাহিদ
হাসিনাকে ফেরত না দিলে ভারত সফর নয়
সিরাজদিখানে জমির শাহানা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
গ্যাস বাড়িতেও নেই, গাড়িতেও নেই: সারা দেশে তীব্র সংকটে হাহাকার
গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েই দেশে ফিরলেন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
বহু বছর পর যোগ্য রাষ্ট্রপতি পাচ্ছে দেশ: আসিফ নজরুল
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) ২৬ আগস্ট
দিন গোনা ছাড়া আমার আর কিছু করার নেই: বিদ্যুৎমন্ত্রী
রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতায় যুক্ত ঢাবির ৯২ শিক্ষক
হাসিনার প্রত্যর্পণ ঠিক না হলে তারেক রহমান ভারতে যেতে পারবেন না: নাহিদ ইসলাম
মার্কিন রণতরীতে নাবিকদের আত্মহত্যাচেষ্টার হিড়িক
টেস্ট ইতিহাসের সেরা দিন পার করলো বাংলাদেশ