ডপলার জনমত জরিপ
সরকারের চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্টি বেশি
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রম নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচালিত এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমের তুলনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতা নিয়ে মানুষের সন্তুষ্টি বেশি। জরিপে অংশ নেয়া ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিপরীতে সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমে সন্তুষ্টির হার ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কার্যালয়ে ডপলার ওপিনিয়ন রিসার্চ আয়োজিত ‘ডপলার অ্যাপ্রুভাল রেটিং সার্ভে ২০২৬’-এর ফল প্রকাশ ও আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২১ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা প্রধানমন্ত্রীর কাজকে নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছেন। ১২ দশমিক ১ শতাংশ কোনও মতামত দেননি বা উত্তর দিতে চাননি।
অন্যদিকে সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমকে ভালো বলেছেন ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা। ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ সরকারের কার্যক্রমকে নেতিবাচক হিসেবে দেখেছেন।
জরিপের সামগ্রিক ফলকে ‘সতর্ক আশাবাদ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের মধ্যে আশা থাকলেও পরিবারের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন উত্তরদাতাদের বড় অংশ।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সমর্থন বিভিন্ন শ্রেণিতেই বেশি
বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা ও আয়ের মতো বিভিন্ন শ্রেণিতে প্রধানমন্ত্রীর কাজের প্রতি সন্তুষ্টির হার ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
দেশের আট বিভাগেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্টির হার ৬২ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব শুধু কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চল বা শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। বিএনপি সমর্থকদের পাশাপাশি অন্য রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রীর কাজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে।
জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দেশের গতিপথ নিয়ে বিভক্ত মত
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতার তুলনায় দেশের সামগ্রিক গতিপথ নিয়ে মানুষের মতামত বেশি বিভক্ত।
জরিপে ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, বাংলাদেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে। বিপরীতে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন, দেশ ভুল পথে যাচ্ছে। ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ এ বিষয়ে কোনও মতামত দেননি বা উত্তর দিতে চাননি।
রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে এ প্রশ্নে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। বিএনপির সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন দেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে এ হার ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিভাগভেদেও পার্থক্য রয়েছে। ময়মনসিংহে ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দেশের গতিপথকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। খুলনায় এ হার ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গেও দেশের গতিপথ নিয়ে ইতিবাচক ধারণার পার্থক্য পাওয়া গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন উত্তরদাতাদের ৫৪ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন দেশ সঠিক পথে আছে। এ হার এইচএসসি পাসকারীদের মধ্যে ৪১ দশমিক ১ শতাংশ।
বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্য বড় উদ্বেগ
দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী—এ প্রশ্নে কোনও নির্দিষ্ট তালিকা দেয়া হয়নি। উত্তরদাতাদের নিজেদের মতো করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে বলা হয়।
এতে ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিকে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামকে বড় সমস্যা বলেছেন ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ।
এরপর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানকে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যেসব বিষয়কে মানুষ সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন, সেসব ক্ষেত্রেই সরকারের কার্যক্রমের মূল্যায়ন তুলনামূলকভাবে বেশি নেতিবাচক।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, সরকার বিষয়টি খারাপভাবে সামলাচ্ছে। জ্বালানি ও গ্যাস ব্যবস্থাপনা নিয়ে ৭৯ দশমিক ৬ শতাংশ নেতিবাচক মত দিয়েছেন।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা নিয়েও ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা নেতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন।
জরিপে সরকারের সাতটি খাতের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হয়। এর মধ্যে শুধু শিক্ষা খাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইতিবাচক মূল্যায়ন পাওয়া গেছে। ৭০ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, সরকার শিক্ষা খাত ভালোভাবে পরিচালনা করছে।
পরিবারের আর্থিক অবস্থায় চাপ
সরকারের প্রথম ছয় মাসের সময়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবার অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে পড়েছে বলেও জরিপে উঠে এসেছে।
৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, এক বছর আগের তুলনায় তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়েছে। বিপরীতে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছেন, তাদের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
তবে আগামী এক বছর নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ মনে করেন, আগামী ১২ মাসে তাদের পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বিপরীতে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ আরও খারাপ পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন।
দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ এক বছর আগের তুলনায় বেশি আশাবাদী। ৩৯ শতাংশ এখন আগের চেয়ে কম আশাবাদী। মাত্র ৬ দশমিক ২ শতাংশ বলেছেন, তাদের আশাবাদে কোনও পরিবর্তন হয়নি।
তবে জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ আশাবাদকে মূলত মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবে দেখা উচিত; বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতির সরাসরি প্রমাণ হিসেবে নয়।
ফ্যামিলি কার্ডে ব্যাপক সমর্থন
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রতিও মানুষের সমর্থনের চিত্র পাওয়া গেছে। জরিপে ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা ফ্যামিলি কার্ডের পক্ষে মত দিয়েছেন।
সরকারের করনীতিকে সমর্থন করেছেন ৭০ দশমিক ৭ শতাংশ। গণভোটের ফল সরকারকে বাস্তবায়ন করা উচিত বলে মনে করেন ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা।
বিরোধী নেতাদের নিয়েও জনমত
জরিপে বিরোধী দলের নেতাদের কার্যক্রম নিয়েও মানুষের মতামত নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের কার্যক্রমকে ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়কের বিষয়ে ইতিবাচক মত দিয়েছেন ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ।
তবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উত্তরদাতা জানিয়েছেন, এ দুই নেতার কার্যক্রম মূল্যায়নের মতো পর্যাপ্ত তথ্য তাদের জানা নেই। জামায়াত আমির সম্পর্কে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ এবং এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক সম্পর্কে ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ এমন মত দিয়েছেন।
নিরাপত্তা নিয়ে নারী-পুরুষের ভিন্ন অভিজ্ঞতা
নিজ এলাকায় রাতে একা হাঁটার সময় নিরাপদ বোধ করেন কি না—এ প্রশ্নেও নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য পাওয়া গেছে।
৭০ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ জানিয়েছেন, অন্ধকারের পর নিজ এলাকায় একা হাঁটলে তারা নিরাপদ বোধ করেন। নারীদের মধ্যে এ হার ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ।
সামগ্রিকভাবে ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, প্রকাশ্যে নিজেদের ধর্ম পালন করতে তারা নিরাপদ বোধ করেন। মুসলিম উত্তরদাতাদের মধ্যে এ হার ৯৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং হিন্দু উত্তরদাতাদের মধ্যে ৮২ শতাংশ।
যেভাবে জরিপ
জরিপ পরিচালনার জন্য মোট ১০ হাজার ৪১৩টি নম্বরে ফোন করা হয়। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪৪৩ জন উত্তরদাতা কম্পিউটার সহায়তায় টেলিফোন সাক্ষাৎকারে অংশ নেন। সাফল্যের হার ছিলো ৩৩ দশমিক ১ শতাংশ।
দেশের ৬৪ জেলার ৪৮৯টি ওয়ার্ড ও গ্রাম থেকে উত্তরদাতাদের নেয়া হয়। বাংলাদেশে ২০২২ সালের জনশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে জরিপের ফল ভারসাম্যপূর্ণ করা হয়েছে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
জরিপে ইনোভিশনের ‘পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে’র দ্বিতীয় ধাপের প্যানেল ব্যবহার করা হয়েছে।
‘সরকারের হানিমুন পিরিয়ড প্রায় শেষ’
জরিপের ফল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শান বলেন, নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত জনমত যাচাই করা জরুরি। নির্বাচন না থাকলে জনমত সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তার মতে, জরিপের ফল ইঙ্গিত করছে, সরকারের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ প্রায় শেষ। বর্তমান অনুমোদনের হার দিয়ে সরকারের হাতে যে রাজনৈতিক পুঁজি রয়েছে, তা সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমের দুর্বলতাকে আড়াল করা উচিত নয়। প্রধানমন্ত্রীর উচ্চ অনুমোদন সরকারের জন্য স্বস্তির বিষয় হলেও একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত করছে যে প্রধানমন্ত্রীর ভালো পারফরম্যান্সের সঙ্গে মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের কার্যক্রমের সমান প্রতিফলন ঘটছে না।
মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি চাঁদাবাজি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মতো বিষয়গুলোকে সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এসব চ্যালেঞ্জ কার্যকর ও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলায় সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সব মিলিয়ে ডপলার জরিপের ফল বলছে, সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা এখনও উল্লেখযোগ্য—বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতা নিয়ে সন্তুষ্টির কারণে। তবে এ আস্থা ধরে রাখতে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনসেবায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার চাপ সরকারের ওপর ক্রমেই বাড়ছে।
সবার দেশ/কেএম




























