আমন্ত্রণ পাননি বঙ্গভবনে
‘দুঃখ পেয়েছেন’ চুপ্পু
বঙ্গভবনের ঐতিহাসিক দরবার হল তখন কানায় কানায় পূর্ণ। রাষ্ট্রীয় আয়োজন, শপথের আনুষ্ঠানিকতা, অতিথিদের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে যেনো বঙ্গভবনে উৎসবের আবহ। মঞ্চে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শপথবাক্য পাঠ করাচ্ছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। পাশে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সামনের সারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এক পাশে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, অন্য পাশে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিরোধীদলীয় নেতা, মন্ত্রিসভার সদস্য, বিদেশি কূটনীতিক, প্রধান বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধান—রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রায় সবাই উপস্থিত।
কিন্তু এতসব ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মুখের ভিড়ে একটি অনুপস্থিতি শেষ পর্যন্ত বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো—সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু নেই!
রাষ্ট্রপতির চেয়ার বদলেছে, বঙ্গভবনের মঞ্চ বদলেছে, অতিথিদের সারিও পূর্ণ হয়েছে—শুধু সাবেক রাষ্ট্রপতির জন্য একটি চেয়ারও যেন খালি রাখা হয়নি। অন্তত সাবেক রাষ্ট্রপতি নিজেই বলছেন, তিনি আমন্ত্রণই পাননি।
দাওয়াতের তালিকায় ‘চুপ্পু’ নামটি কোথায়?
সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি কেনো শপথ অনুষ্ঠানে নেই—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই খোঁজ শুরু হয় বঙ্গভবন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতিকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনও নির্দেশনা ছিলো না।
বঙ্গভবনের জনবিভাগের এক কর্মকর্তার ভাষ্যও অনেকটা একই। তার দাবি, শপথ অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বঙ্গভবন সেখানে মূলত ভেন্যু ও আয়োজনের দায়িত্ব পালন করে। সাবেক রাষ্ট্রপতির জন্য আসন রাখার কোনও নির্দেশনা না থাকায় সে অনুযায়ী কোনও ব্যবস্থাও করা হয়নি।
অর্থাৎ, বিষয়টি অনেকটা এমন—অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণপত্রের তালিকায় নাম না থাকলে দরবার হলের দরজায় দাঁড়িয়ে ‘আমি তো সাবেক রাষ্ট্রপতি’ বলেও ঢোকার সুযোগ নেই!
‘আমি আমন্ত্রণ পাইনি, দুঃখিত ও বিব্রত’
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সরাসরি করা হয় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছেই।
জবাবটিও সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাতে অভিমান স্পষ্ট।
তিনি বলেন,
আমি আমন্ত্রণ পাইনি। বিষয়টি নিয়ে দুঃখিত ও বিব্রত। আমি আর কিছু বলতে চাই না।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে বঙ্গভবন ছাড়ার পর নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না পাওয়ার ঘটনা যে তার ভালো লাগেনি, কথার মধ্যেই তা পরিষ্কার।
রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের ভাষায় এটি হয়তো ‘আমন্ত্রণ না পাওয়া’; কিন্তু ব্যক্তিগত অনুভূতির অভিধানে সেটি যে বেশ বড় ধরনের ‘মন খারাপ’, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
শরীরও ভালো যাচ্ছে না
শুধু আমন্ত্রণ না পাওয়ার কষ্টই নয়, শারীরিকভাবেও ভালো সময় পার করছেন না সাবেক রাষ্ট্রপতি।
নিজের শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আগের তুলনায় শরীর আরও খারাপ যাচ্ছে। তার পা ফুলে গেছে এবং স্বাভাবিক হাঁটাচলাতেও সমস্যা হচ্ছে।
এ সময় দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।
কেনো সরে গেলেন চুপ্পু?
এর আগে গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন।
পদত্যাগপত্রে তিনি নিজের গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেন। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভোগার পাশাপাশি তার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারিও হয়েছে বলে জানান।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’ শনাক্ত হওয়ার কথাও পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ রোগের কারণে মাঝে মাঝে তিনি সাময়িকভাবে অচেতন হয়ে পড়েন।
এসব শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না—এমন কারণ দেখিয়েই সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের অধীনে পদত্যাগ করেন তিনি।
তিন সরকারের রাষ্ট্রপতি, শেষমেশ ‘নিমন্ত্রণহীন’ সাবেক
মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের এপ্রিলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘটে যায় বড় ধরনের পালাবদল।
রক্তাক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায়—সবকিছু পেরিয়েও তিনি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির পদে বহাল ছিলেন।
ফলে তার রাষ্ট্রপতি জীবনের সময়কালটি ছিলো রাজনৈতিকভাবে ব্যতিক্রমী। আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে যাত্রা শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও বঙ্গভবনে ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত বিএনপি সরকারের আমলেও কিছু সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে। যে পদ একসময় ছিলো রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ সাংবিধানিক আসনগুলোর একটি, সে পদ থেকেই শেষ পর্যন্ত বিদায় নিতে হয়েছে তাকে।
আর বিদায়ের পর নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানে তার অনুপস্থিতি নতুন করে জন্ম দিয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা প্রশ্নের।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নটি অবশ্য খুবই সরল—
রাষ্ট্রপতি থাকাকালে যার জন্য বঙ্গভবনের দরজা ছিলো খোলা, সাবেক রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর সে দরজার নিমন্ত্রণ তালিকাতেই কি তার নাম আর জায়গা পেলো না?
চুপ্পুর নিজের উত্তর—
আমন্ত্রণ পাইনি। দুঃখিত ও বিব্রত।
রাজনীতির মঞ্চে চেয়ার বদলানো নতুন কিছু নয়। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কখনও কখনও দেখা যায়, চেয়ার বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় চেয়ারটির চারপাশের মানুষ, আমন্ত্রণপত্রের তালিকা—এমনকি দরবার হলের একটি আসনের গুরুত্বও।
সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর ক্ষেত্রে আপাতত গল্পটা সেখানেই এসে থেমেছে—রাষ্ট্রপতি গেলেন, নতুন রাষ্ট্রপতি এলেন; বঙ্গভবনে শপথ হলো, অতিথিরা এলেন—শুধু আগের রাষ্ট্রপতি এলেন না। কারণ, তার ভাষায়, তাকে ডাকা হয়নি।
সবার দেশ/কেএম




























