নিষিদ্ধ বয়ান
গুপ্ত-সুপ্ত সমাচার!
খুনি হাসিনার শাসনের দীর্ঘ সাড়ে ষোল বছরের অন্ধকার অধ্যায়ে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী রাজনীতির অসংখ্য মানুষ এক অদৃশ্য, অলিখিত বাস্তবতার শিকার হয়েছেন—যাকে আমরা 'গুপ্ত রাজনীতি' বলি।
কেউ আত্মগোপনে থেকেছেন দেশের ভেতরে, কেউবা নির্বাসনে পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে। নচেৎ ইতিহাসের অনেক দৃশ্যপট হয়তো ভিন্নরূপ ধারণ করতো—সময়ের আগে বালুর ট্রাক সরিয়ে নেয়া যেতো, বেগম খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি টিকে থাকতো, মগবাজারের সেই তালাও হয়তো ভাঙা যেতো।
এ বাস্তবতার আলোকে 'গুপ্ত' শব্দটিকে ঘিরে আজকের রাজনৈতিক অপপ্রয়াস নিছকই হাস্যকর। শব্দটি নিজে অশ্লীল নয়; অশ্লীলতা নিহিত থাকে তার প্রয়োগে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কিছু তথাকথিত শিক্ষিত মানুষও 'অশ্লীল শব্দ' এবং 'শব্দের অশ্লীল ব্যবহার'—এ মৌলিক পার্থক্যটুকু অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন।
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই—জুলাই আন্দোলনের সূচনালগ্নে আমিও কিছুদিন কৌশলী, কিংবা কথিত 'গুপ্ত' অবস্থানে ছিলাম। যখন দমন-পীড়নের যন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, জঙ্গিলীগ মোবাইল ফোন তল্লাশি করে ফেসবুক আইডি যাচাই করতে শুরু করলো, তখন বাধ্য হয়ে বাসা, অফিসের বাহিরে স্মার্টফোন ছেড়ে বাটন ফোন ব্যবহার করেছি কিছুদিন। লক্ষ্য ছিলো স্পষ্ট—শেখ মুজিবুর রহমানের মতো স্বেচ্ছায় ধরা না দিয়ে, অন্তরালে থেকেও আন্দোলন/এক্টিভিজমে সক্রিয় থাকা। আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষত জুলাইয়ের ১৫ তারিখের পর, আবার প্রকাশ্যে ফিরে এসে রাজপথে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছি—যেমনটি করেছেন আরও অনেকে। এ সময় বিএনপি-জামায়াতও কৌশলী বা 'গুপ্ত' আন্দোলনের পথে এগিয়েছে। দলীয় পরিচয়, স্লোগান কিংবা ব্যানার থেকে দূরে থেকে তারা নিজেদের সম্পৃক্ততা আড়াল করেছে। বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হলেও মির্জা ফখরুল ইসলামের সে বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে—'বিএনপি এ আন্দোলনে জড়িত নয়।' অথচ বাস্তবতা ভিন্ন গল্প বলে।নেত্রী
আরও গভীরে গেলে দেখা যায়—মহীয়সী নারী তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ অসংখ্য নেতা-নেত্রী দেশে অবস্থান করেই প্রায় সতেরো বছর ধরে একপ্রকার গুপ্ত বা সুপ্ত অবস্থায় আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। কেউ কারাগারে জীবন কাটিয়েছেন, কেউ মৃত্যুদণ্ড মেনে নিয়েছেন অবিচল চিত্তে। জামায়াতের শীর্ষ নেতারা ফাঁসির মঞ্চে উঠে আত্মোৎসর্গ করেছেন, বিএনপির সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীও একই পরিণতি বরণ করেছেন। ইচ্ছা করলে তারাও অনেকের মতো বিদেশে আশ্রয় নিতে পারতেন, কিন্তু নেননি—এটাই তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের শক্তি।
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সময়ের কিছু ব্যক্তি—ড. খলিলুর রহমান, মো. আসাদুজ্জামান কিংবা ডা. জাহেদুর রহমানের মতো তথাকথিত সুশীলেরা—বিএনপিকে নিজেদের 'গুপ্ত সার্ভিস' দিয়ে আলোচিত হয়েছেন, এবং বিস্ময়করভাবে বিএনপিও তাদের পুরস্কৃত করেছে। এ এক নৈতিক দ্বন্দ্বের চিত্র, যা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
তবে এটাও সত্য—গুপ্ত বা কৌশলী রাজনীতি নতুন কিছু নয়; এটি ইতিহাসের বহু পুরোনো কৌশল। কিন্তু শব্দের অপব্যবহার যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তা কেবল ভাষার অবমাননাই নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক অরাজকতার জন্ম দেয়।
শহীদ ওসমান হাদির মতো ব্যক্তিত্ব 'শাউয়া-মাউয়া'র মতো আপাত অশালীন শব্দকেও দার্শনিক গভীরতায় ইতিবাচক অর্থে ব্যবহার করেছেন—শব্দচয়নের পাণ্ডিত্য দিয়ে। আর আজ দেখা যাচ্ছে, কিছু গোষ্ঠী 'গুপ্ত'র মতো শালীন শব্দকেও বিকৃত প্রয়োগে অশ্লীলতার পর্যায়ে নামিয়ে আনছে। দেয়ালে আঁকা জুলাইয়ের গ্রাফিতি মুছে দিয়ে তারা এক ধরনের 'গুপ্তময়' বিকৃতি ছড়িয়ে দিচ্ছে—যা সংস্কৃতি নয়, বরং বিকারগ্রস্ততার বহিঃপ্রকাশ।
সুতরাং, সমস্যাটি শব্দে নয়—সমস্যা তার প্রয়োগে, দৃষ্টিভঙ্গিতে, এবং শিক্ষার গভীরতায়। সুশিক্ষা মানুষকে শব্দের মর্যাদা বুঝতে শেখায়; আর অশিক্ষা সেই শব্দকেই অস্ত্র বানিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করে। পার্থক্যটা ঠিক এখানেই।
লেখক ও সংবাদকর্মী




























