কলেজশিক্ষিকাকে জুতাপেটা করার পেছনের বিস্ফোরক তথ্য
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে এক নারী শিক্ষিকাকে জুতাপেটা, শিক্ষকদের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। তবে ঘটনার নেপথ্যে কী ছিলো—তা নিয়ে সামনে এসেছে ভিন্ন ভিন্ন বয়ান।
প্রত্যক্ষদর্শী, শিক্ষক ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুরে কলেজে ২০২৪ সালের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলছিলো। পরীক্ষাকেন্দ্র হওয়ায় পুরো এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি ছিলো এবং পুলিশও মোতায়েন ছিলো।
এ সময় জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলী, যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি শাহাদাত আলী, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও বিএনপি নেতা আব্দুস সামাদসহ ৭-৮ জনের একটি দল অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা ইসলামী জলসার নামে চাঁদা দাবি করেন এবং আগের প্রশাসনের সময়কার আয়-ব্যয়ের হিসাব চান। এ নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে তাদের তর্কাতর্কি শুরু হয়।
একপর্যায়ে উপস্থিত প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা মোবাইলে ভিডিও ধারণ শুরু করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভিডিও ধারণে বাধা দিতে গেলে ওই শিক্ষিকা শাহাদাত আলীকে চড় মারেন। এর পরপরই শাহাদাত আলী স্যান্ডেল খুলে তাকে মারধর করেন। ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
এর জেরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর বিএনপির আরও নেতাকর্মী কলেজে ঢুকে অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাকসহ একাধিক শিক্ষকের ওপর হামলা চালায় এবং অফিস কক্ষে ভাঙচুর করে। হামলায় অন্তত পাঁচজন আহত হন, যাদের মধ্যে কয়েকজনকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ঘটনার পর থেকে ভুক্তভোগী শিক্ষকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক ও প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরাসহ কয়েকজন আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী কলেজ ও আশপাশের প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করছিলো। অধ্যক্ষ নতুন দায়িত্ব নেয়ার পর সে দাবি প্রত্যাখ্যান করায় বিরোধ তীব্র হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা সহিংসতায় রূপ নেয়।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বাজারে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আগেও ছিলো। তারা একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছে, যার কারণে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পান না।
অন্যদিকে বিএনপি নেতা আকবর আলী ভিন্ন দাবি করে বলেন, তারা কলেজের পূর্বের অনিয়ম ও দুর্নীতির হিসাব চাইতে গেলে উল্টো তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে শিক্ষিকাই হামলা করেন এবং পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
ঘটনার সময় পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি—এমন অভিযোগও উঠেছে। তবে দুর্গাপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিলো, কিন্তু কিছু লোক জোর করে প্রবেশ করে হামলা চালায়।
রাজশাহী জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মুখপাত্র সাবিহা ইয়াসমিন জানান, এখনও কোনও লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
ঘটনাটি এখন শুধু একটি হামলার ঘটনা নয়, বরং স্থানীয় রাজনীতি, প্রভাব বিস্তার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























