Sobar Desh | সবার দেশ ডঃ মোহাম্মদ নূরুজ্জামান


প্রকাশিত: ১০:২৩, ২৩ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ১০:২৮, ২৩ মার্চ ২০২৬

স্কিল বাংলাদেশ: বৈশ্বিক শ্রমবাজারে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা

স্কিল বাংলাদেশ: বৈশ্বিক শ্রমবাজারে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা
ছবি: সবার দেশ

[এ ধারাবাহিক ফিচারের পূর্ববর্তী পর্বগুলোতে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জনের জাতীয় ভিশন, জিরো মাইগ্রেশন কস্ট বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় রিভলভিং ফান্ড, প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে দেশে উদ্যোক্তা তৈরির ‘Remit–Return–Rebuild’ মডেল, শ্রমবাজারের অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের বাস্তবতা, একটি আধুনিক ডিজিটাল মাইগ্রেশন ইকোসিস্টেমের প্রয়োজনীয়তা এবং সর্বশেষ পর্বে শ্রম কূটনীতির মাধ্যমে বৈশ্বিক চাহিদা সৃষ্টিতে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।]

পর্ব–০৭

এ ধারাবাহিক আলোচনার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে এখন সামনে আসে একটি মৌলিক প্রশ্ন—এ সব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক শ্রমবাজারে কী পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে? আমরা কি শুধুই একটি বৃহৎ শ্রম সরবরাহকারী দেশ হয়ে থাকবো, নাকি একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করবো—যেখানে বাংলাদেশ পরিচিত হবে দক্ষতা, সততা এবং পেশাদারিত্বের জন্য?

এ প্রশ্নের উত্তরেই উঠে আসে একটি শক্তিশালী ধারণা—‘স্কিল বাংলাদেশ’। এটি কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল—যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি বিশ্বাসযোগ্য, দক্ষ ও দায়িত্বশীল মানবসম্পদের উৎস হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।

বৈশ্বিক শ্রমবাজারে ব্র্যান্ডিং: 

কেনো এখন অপরিহার্য বর্তমান বিশ্বে শ্রমবাজার আর শুধুমাত্র ‘মানুষ পাঠানো’ নয়—এটি একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার, যেখানে দেশগুলো নিজেদের মানবসম্পদকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে উপস্থাপন করছে। ফিলিপাইন বহু বছর ধরে স্বাস্থ্যসেবা খাতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। ‘Filipino Nurse’ বা ‘Filipino Caregiver’ এখন একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। একইভাবে ভিয়েতনামি কর্মীদের শৃঙ্খলা, জাপানি কর্মীদের পেশাদারিত্ব বা জার্মানির কারিগরি দক্ষতা—এসবই একটি শক্তিশালী জাতীয় ব্র্যান্ডের উদাহরণ। বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত মূলত ‘সংখ্যার ভিত্তিতে’ শ্রমবাজারে পরিচিত। কিন্তু ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে আমাদের প্রয়োজন ‘মানের ভিত্তিতে’ পরিচিত হওয়া। এ পরিবর্তনের জন্যই প্রয়োজন—‘স্কিল্ড বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং। 

স্কিল্ড বাংলাদেশের তিনটি মৌলিক স্তম্ভ:

‘স্কিল্ড বাংলাদেশ’ ধারণাটি তিনটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে—

১. দক্ষতা:

বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে দক্ষতার কোনও বিকল্প নেই। বাংলাদেশের কর্মীদের শুধুমাত্র শারীরিক শ্রমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বরং তাদেরকে নির্দিষ্ট ট্রেডে প্রশিক্ষিত হতে হবে—নির্মাণ প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও কেয়ারগিভিং, অটোমোবাইল ও মেকানিক্যাল কাজ, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স, আইটি ও ডিজিটাল সার্ভিস, কৃষি ও এগ্রি-টেক। প্রশিক্ষণ হতে হবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং সার্টিফিকেশন হতে হবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

২. সততা:

দক্ষতা থাকলেও আস্থা না থাকলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা সম্ভব নয়। সময়নিষ্ঠতা, দায়িত্ববোধ, চুক্তি মানার প্রবণতা—এসব গুণ যদি একটি দেশের কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে নিয়োগকর্তারা সে দেশের কর্মীদের অগ্রাধিকার দেয়।

বাংলাদেশি কর্মীদের একটি বড় শক্তি হলো তাদের পরিশ্রমী মনোভাব। এ শক্তির সঙ্গে যদি পেশাগত সততা যুক্ত হয়, তাহলে তা বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে।

৩. আচরণ ও পেশাদারিত্ব:

আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে শুধু কাজ জানা যথেষ্ট নয়—জানতে হয় কীভাবে কাজ করতে হয়।

  • সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ
  • কাজের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান
  • দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতা
  • ভাষাগত সক্ষমতা

এসব বিষয় কর্মীর সাফল্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভাষা ও সংস্কৃতি (অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী দক্ষতা):

জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া বা ইউরোপের অনেক দেশে কাজ করতে গেলে ভাষা দক্ষতা একটি বড় ভূমিকা রাখে।

একজন কর্মী যদি স্থানীয় ভাষার মৌলিক জ্ঞান রাখেন, তাহলে—

  • তিনি দ্রুত কাজ শিখতে পারেন
  • নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়
  • ভুল বোঝাবুঝি কমে
  • কর্মস্থলে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে

তাই দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে ভাষা ও সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার রূপান্তর:

‘স্কিল বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের জন্য দেশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে—

  • আন্তর্জাতিক কারিকুলাম অনুসরণ
  • শিল্পখাতের সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ
  • আধুনিক ল্যাব ও সিমুলেশন
  • ডিজিটাল স্কিল ট্রেনিং
  • ভাষা শিক্ষা

এ ব্যবস্থায় শুধু প্রশিক্ষণ নয়—দক্ষতার মান যাচাই (skill validation) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রিক্রুটিং এজেন্সি—অংশীদার হিসেবে নতুনভাবে দেখা:

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে একটি বড় বাস্তবতা হলো—রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। দীর্ঘদিন ধরে তারা বিদেশি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে, ডিমান্ড সংগ্রহ করেছে এবং কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াকে কার্যকর করেছে। কিন্তু কিছু অসাধু কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো খাতটি নেতিবাচকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ‘স্কিল বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের জন্য এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।

  • ভালো এজেন্সিকে স্বীকৃতি দিতে হবে
  • খারাপদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে

এ ভারসাম্য না আনলে কোনো ব্র্যান্ড টেকসই হবে না।

আরও পড়ুন <<>> শ্রম কূটনীতি ২.০: বিদেশে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগে অগ্রাধিকার

শ্রম কূটনীতি ও ব্র্যান্ডিং–-একে অপরের পরিপূরক: 

পূর্ববর্তী পর্বে আমরা আলোচনা করেছি শ্রম কূটনীতির গুরুত্ব।
বাস্তবতা হলো—

  • ব্র্যান্ড ছাড়া বাজার পাওয়া কঠিন
  • বাজার ছাড়া ব্র্যান্ড টিকে না

তাই ‘স্কিল বাংলাদেশ’ এবং শ্রম কূটনীতি—দুটোই একসাথে এগোতে হবে।

বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা:

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বড় সুযোগ রয়েছে।

  • বিশ্বের অনেক দেশে—
  • জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমছে
  • বয়স্ক জনগোষ্ঠী বাড়ছে
  • দক্ষ কর্মীর ঘাটতি তৈরি হচ্ছে

এ শূন্যতা পূরণ করতে পারে বাংলাদেশ—যদি আমরা সঠিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারি।

১০০ বিলিয়ন রেমিট্যান্স: 

স্বপ্ন থেকে বাস্তবতা যদি আমরা বছরে ১৫ লাখ দক্ষ কর্মী (এখন গড়ে ১০ লক্ষ যাচ্ছে, বেশিরভাগই অদক্ষ) আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠাতে পারি, এবং তাদের গড় আয় বৃদ্ধি পায়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন অসম্ভব নয়। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন—

  • দক্ষতা উন্নয়ন
  • স্বচ্ছ নিয়োগ
  • রাষ্ট্রীয় সহায়তা
  • শক্তিশালী ব্র্যান্ড

এ চারটি উপাদান একত্রিত হলেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব।

উপসংহার: 

একটি নতুন পরিচয়ের পথে বাংলাদেশ আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা চাইলে আগের মতোই শুধু শ্রম পাঠিয়ে যেতে পারি। অথবা আমরা চাইলে একটি নতুন পথ বেছে নিতে পারি—
যেখানে বাংলাদেশ পরিচিত হবে—

  • দক্ষতার জন্য
  • সততার জন্য
  • পেশাদারিত্বের জন্য

এ পথের নাম—স্কিল বাংলাদেশ।

এটি শুধু একটি ব্র্যান্ড নয়; এটি একটি জাতীয় প্রতিশ্রুতি। এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে, ১০০ বিলিয়ন রেমিট্যান্স আর কেবল একটি লক্ষ্য থাকবে না—এটি হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির একটি নতুন ভিত্তি।

লেখক
শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান কর্মী
ড্যাফোডিল গ্রুপ সিইও

সম্পর্কিত বিষয়:

শীর্ষ সংবাদ:

৭ নভেম্বরের র‌্যালিতে নেতৃত্ব দেবেন তারেক রহমান
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি, কাজে ফিরছেন শ্রমিকরা
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে
বাংলাদেশকে অভিবাসনের গন্তব্য করতে চান স্পিকার
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ভোটারদের রায়, শুরু পতনের অধ্যায়
সেন্টমার্টিনে আজ থেকে চলবে ৩ পর্যটকবাহী জাহাজ
নিশো-মেহজাবীনের ‘অপলক’
মেসি-রোনালদোসহ ২৬ তারকা ভোটযুদ্ধের মহড়ায়
ছুরিকাঘাতে জামায়াত নেতা আক্তারুজ্জামানের ছেলে গুরুতর আহত
মেঘনা বিএনপির কমিটি নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ
ট্রাম্পকে ময়লার পাত্রে ফেললো ইরানি দূতাবাসের ভিডিও
হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী আটক
তিতাসে নতুন দুই কূপ, দৈনিক মিলবে ৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস
আমেরিকানরা ‘বিরক্ত’ হলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হবো: ট্রাম্প
গাজীপুর-সাভারে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়
কল্যাণপুরে বাস-লেগুনার সংঘর্ষ, নারীসহ নিহত ৪
আওয়ামী প্রেতাত্মা হাসানুজ্জামানকে দুদকের মহাপরিচালক নিয়োগ