উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তি এবং মানবিকতার সমন্বয়
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিশ্ব আজ দ্রুত পরিবর্তনশীল। প্রযুক্তি, অর্থনীতি, সামাজিক এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ আমাদের জীবন ও শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে নানাভাবে প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত, যা সমাজ ও দেশের ভবিষ্যৎ গঠন করে।
অতীতে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে মূলত তাত্ত্বিক শিক্ষা এবং দীর্ঘদিন একই সিলেবাসের উপর নির্ভর করতো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। এখন শিক্ষার্থীরা চায় তাদের শেখা জ্ঞান বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজে লাগাতে সক্ষম হোক। পাশাপাশি কর্পোরেট এ যারা নিয়োগকর্তা আছেন তারাও চান শিক্ষার্থীরা যেনো কিছু ব্যবহারিক কাজ কর্ম শিখে আসুক। যাতে করে তারা দ্রুতই কর্মস্থলে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে সে আশায়। এ পরিবর্তনের ফলে উচ্চশিক্ষা একটি নতুন রূপান্তরের মুখোমুখি হয়েছে। তবে সরকারী চাকরির জন্য এ ধারণা ভিন্ন। কারণ সরকার তার নিজের প্রয়োজনে তার কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যোগ্য করে তোলে।
বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষা আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের মুখোমুখি। গত কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী ঘটে যাওয়া বৈশ্বিক পরিবর্তন, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রথাগত শিক্ষার কাঠামোকে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা দেখিয়েছে। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর অনেক শিক্ষার্থীই বুঝতে পারে যে, তাদের অর্জিত ডিগ্রি বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর নয়। ফলে শিক্ষাব্যবস্থা এবং শ্রমবাজারের মধ্যে একটি ফাঁক তৈরি হয়েছে, যা অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এই ফাঁক পূরণ করতে, বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইন্ডাস্ট্রি এবং একাডেমিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ঘটানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের শিক্ষাদানে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। ব্যবসা, প্রযুক্তি, আইন, প্রশাসন—প্রতিটি ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা বাড়াচ্ছে এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও শক্তিশালী করছে।
ইদানীং আমাদের দেশের শিক্ষার পদ্ধতিতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। অনলাইন, হাইব্রিড এবং ব্লেন্ডেড লার্নিং এখন উচ্চশিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ। আগে যেখানে শিক্ষা নির্দিষ্ট সময় ও স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো, এখন তা অনেকটাই মুক্ত। শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সে অংশ নিতে পারছে। এটি শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশে শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট সংযোগ, ডিভাইস এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবে পুরো সুবিধা নিতে পারছে না। ফলে শিক্ষায় নতুন ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ইদানীং কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ দানের জন্য পেশাগতভাবে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন। তারা ছাত্রদের তাত্ত্বিক বিষয়ের পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞান দান করছেন। তাদের কাজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন। যোগ্য করে তুলছেন কর্মজীবনের বাস্তবতায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায় খুলেছে। চ্যাটজিপিটি সহ বিভিন্ন AI টুল শিক্ষার্থীদের শেখার পদ্ধতিকে দ্রুত, সহজ এবং কার্যকর করছে। গবেষণা, বিশ্লেষণ এবং লেখালিখিতে এআই-এর ব্যবহার বাড়ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা কম সময়ে বেশি কাজ করতে পারছে এবং নতুন ধারণা উদ্ভাবন করতে পারছে। তবে এটি নতুন চ্যালেঞ্জও এনেছে। শিক্ষার্থীরা যদি প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তাদের সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে প্রযুক্তি শিক্ষাকে সমর্থন করবে, কিন্তু শিক্ষার্থীর মৌলিক চিন্তাশক্তি বিকাশের সুযোগ হ্রাস করবে না।
উচ্চশিক্ষার আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হলো বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং। র্যাংকিং অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এর ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। নির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণ করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গবেষণাপত্রের সংখ্যা, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর হার বা উদ্ধৃতির ভিত্তিতে র্যাংকিং নির্ধারণ করা শিক্ষার মান বা সম্প্রসারণের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন, র্যাংকিং-এর পেছনে চাপ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার প্রকৃত মান বৃদ্ধির পরিবর্তে কেবল সূচক উন্নয়নে মনোযোগ দিতে বাধ্য করছে।
আরও পড়ুন <<>> ব্যাংকে পদোন্নতি কেনো থেমে যায়
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটলেও মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ সীমিত, শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ দুর্বল এবং শিক্ষাদানের আধুনিক পদ্ধতি নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে পড়ে এবং চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খায়। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি এবং শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগের বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
মানসিক স্বাস্থ্যও উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। প্রতিযোগিতা, সামাজিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে যে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং মানসিক চাপের হার উদ্বেগজনক। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং একটি সহানুভূতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে সুস্থ থাকলে তাদের শেখার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় এবং তারা সমাজের জন্য আরও অবদান রাখতে পারে।
বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি আগের তুলনায় ভিন্ন। তারা প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত তথ্যপ্রাপ্ত এবং বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত। মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পরিবেশগত টেকসইতা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে এ মূল্যবোধগুলো প্রতিফলিত হয়। শিক্ষার্থীরা কেবল চাকরি অর্জনের জন্য নয়, বরং সমাজে কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য শিক্ষা চায়। তারা জেনারেশন Z বা Zoomers, যারা গ্লোবাল সচেতন, মানবিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী শিক্ষাকৌশল তৈরি করতে হবে।
উচ্চশিক্ষা এখন কেবল পেশাগত দক্ষতা নয়, সামগ্রিক বিকাশের মাধ্যম। এখানে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বগুণ, নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, নতুন ধারণা তৈরি করতে পারে এবং সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। এটি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত উন্নয়ন এবং দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করা। সরকার, শিল্পখাত, শিক্ষক, শিক্ষার্থী—সব পক্ষকে একসাথে কাজ করতে হবে। শুধুমাত্র প্রযুক্তি বা নীতিমালার ওপর নির্ভর করে শিক্ষাকে শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তিকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
উচ্চশিক্ষার রূপান্তর বাস্তবায়ন করতে হলে, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা যদি কেবল চাকরি প্রস্তুতির মাধ্যম হয়, তবে তা সমাজের জন্য পূর্ণাঙ্গ অবদান রাখতে পারবে না। শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা প্রযুক্তিগত দক্ষ, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম।
সবশেষে বলা যায়, উচ্চশিক্ষা বর্তমানে একটি রূপান্তরমূলক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাকে সময়োপযোগী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানবিক করতে পারলেই এটি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত উন্নয়ন এবং সমগ্র সমাজের অগ্রগতির জন্য কার্যকর হতে পারে। এখন পরিবর্তন গ্রহণ করা এবং তা বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। এ নতুন যুগে উচ্চশিক্ষা যদি বাস্তবমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মানবিকভাবে সমৃদ্ধ হয়, তাহলে তা শুধুমাত্র শিক্ষার্থীর জন্য নয়, বরং সমগ্র দেশের জন্য এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করবে।
তথ্য ও প্রযুক্তি হাতের মুঠোয়, একজন শিক্ষার্থী কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের মতো চোখ বন্ধ করে ভর্তি হচ্ছে না, তারা ভালো করে খবর নিচ্ছে, সে যেখানে পড়তে চায় , সেখানে কি কি সুবিধা আছে, যেমনঃ বিদেশী ডিগ্রী ধারী শিক্ষক কত জন আছে, ডক্টরেট শিক্ষক কতজন আছেন, অন্যান্য কাঠামোগত সুবিধা কি কি আছে সেগুলো তারা আজ জানতে চায়। শিক্ষাকে ক্লাসরুমের বাইরে আনতে হবে, ছাত্র-ছাত্রীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হবে, তিন মাস শুধু ইন্টার্ণ করলেই হবে না। প্রতিটি কোর্সের সাথে একটা করে অফিস ভিজিট এর সুযোগ রাখতে হবে। ফলে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞানের পরিধি আরও বাড়বে। আমাদের কর্মক্ষেত্রে দরকার পুঁথিগত জ্ঞানের বাইরের পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞানলব্ধ কর্মী।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংকার




























