ফিন্যানশিয়াল টাইমসকে তারেক রহমান
‘বিএনপি এককভাবে সরকার গঠন করবে, দেশে ফিরবো শিগগিরই’
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ক্ষমতায় আসবে এবং নতুন সরকার গঠন করবে—এ বিষয়ে পূর্ণ আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী দৈনিক ফিন্যানশিয়াল টাইমস-কে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আমরা জয়ী হবো, এবং এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থানে রয়েছি।
দীর্ঘ প্রায় সতেরো বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপনকারী তারেক রহমান জানিয়েছেন, নির্বাচনে অংশ নিতে তিনি দেশে ফিরবেন। তার ভাষায়, আমি মনে করি, আমার বাংলাদেশে ফেরার সময় খুব সন্নিকটে।
তিনি আরও বলেন,
বাংলাদেশে একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন সম্পূর্ণ হবে না। ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থান তখনই তার লক্ষ্য পূরণ করবে।
বিএনপি একক সরকার গঠনের পথে
ফিন্যানশিয়াল টাইমস জানিয়েছে, জনমত জরিপে বিএনপি বর্তমানে এগিয়ে আছে। আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় নিষিদ্ধ করেছেন। শেখ হাসিনার দলকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে ইউনূসের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করেছেন তারেক রহমানও। তিনি বলেন,
বিএনপি অন্যান্য গণতান্ত্রিক দলকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনে প্রস্তুত। ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে নতুন গঠিত দলগুলোকেও রাজনীতিতে স্বাগত জানাবো।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা
সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা সম্পর্কেও কথা বলেছেন। তিনি বলেন, নতুন বিএনপি সরকার আমাজন, ইবে ও আলিবাবার মতো আন্তর্জাতিক ই-কমার্স কোম্পানির জন্য বাংলাদেশকে ‘সরবরাহ কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এর মাধ্যমে তৈরি পোশাক নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করা হবে।
ভারতের সঙ্গে ‘সব কিছুর আগে বাংলাদেশ’ নীতি
তারেক রহমান জানিয়েছেন, তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে স্থাপন করবেন। শেখ হাসিনার সময়কার সম্পর্ককে তিনি ‘একপক্ষীয়’ বলে মন্তব্য করে বলেছেন, আমরা ‘সব কিছুর আগে বাংলাদেশ’ ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করব।
পারিবারিক ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
প্রতিবেদনে ফিন্যানশিয়াল টাইমস বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরে লিখেছে—শেখ হাসিনা স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, যিনি ১৯৭৫ সালে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নিহত হন। অন্যদিকে, তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমানও ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি, যিনি ১৯৮১ সালে এক অভ্যুত্থানে নিহত হন।
বর্তমানে ৫৯ বছর বয়সী তারেক রহমান ২০০৮ সাল থেকে লন্ডনে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা থাকলেও তিনি সেগুলোকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেন।
তিনি বলেন, নতুন বিএনপি সরকার প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসবে। গত বছর থেকেই দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সাত হাজার সদস্যকে বহিষ্কারের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আমরা নিজেদের ভেতর থেকেই সংস্কার শুরু করেছি।
শেখ হাসিনার বিচার প্রসঙ্গে প্রশ্ন
ফিন্যানশিয়াল টাইমস জানায়, আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে বিচার চলমান থাকা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তারেক রহমান বলেন, যদি তারা অপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হয়, তবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে কীভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে?
অতীত ও ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি
প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনকালে বাংলাদেশে ব্যাপক দুর্নীতি, বিরোধী দমন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের মতো ঘটনা ঘটেছে।
তারেক রহমান বলেছেন, ক্ষমতায় এলে তিনি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশাসনের দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবেন। শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা যে শত শত কোটি ডলার বিদেশে পাচার করেছেন—সে অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা চলবে।
তবে প্রতিবেদনে এটিও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় যে, বিএনপি সর্বশেষ ক্ষমতায় থাকাকালে বাংলাদেশ টানা পাঁচ বছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলো।
সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধু তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের বার্তা নয়—বরং দেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনাসূত্রও হতে পারে।
সবার দেশ/কেএম




























