সতীর্থদের ভালোবাসায় সিক্ত ফুটবল কিংবদন্তি
শেষ বাঁশিতে থামলো মেসির গল্প
শেষ ম্যাচেও গোল, দুই অ্যাসিস্ট—‘Gracias Leo’ বার্তায় অশ্রুসিক্ত এক বিদায়
কিছু বিদায় শুধু বিদায় নয়।
কিছু মুহূর্ত শুধু একটি ম্যাচের শেষ নয়।
কিছু শেষ বাঁশি একটি গোটা যুগের সমাপ্তির ঘোষণা দেয়।
বুয়েনস এইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তালে মঙ্গলবার রাতে ঠিক তেমনই একটি মুহূর্তের সাক্ষী হলো। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ছুটে গেলেন একজন মানুষের দিকে। তাকে ঘিরে তৈরি হলো ভালোবাসার বৃত্ত। কেউ জড়িয়ে ধরলেন, কেউ কাঁধে হাত রাখলেন, কেউ শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলেন প্রিয় অধিনায়কের পাশে।
সে মানুষটি—লিওনেল মেসি।
একসময় যাকে নিয়ে আর্জেন্টিনার মানুষ স্বপ্ন দেখেছে, যাঁকে ঘিরে কেঁদেছে, হতাশ হয়েছে, আবার শেষ পর্যন্ত উল্লাসে ভেসেছে—সে মেসি এবার সত্যিই তুলে রাখলেন জাতীয় দলের জার্সি।
বিদায়ী ম্যাচেও যেন মেসি জানিয়ে গেলেন, কেনো তিনি মেসি।
বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ে একটি গোল করেছেন তিনি, করিয়েছেন আরও দুটি। অর্থাৎ ম্যাচের তিন গোলেই কোনও না কোনওভাবে জড়িয়ে ছিলো তার নাম।
৪৮ মিনিটে মেসির কর্নার থেকে নিকোলাস ওতামেন্দির গোল। ৬০ মিনিটে তার পাস থেকে নিকো পাজের গোল। আর ৭১ মিনিটে নিজের জন্য লেখা শেষ অধ্যায়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল লাইনটি নিজেই লিখলেন মেসি—পেনাল্টি থেকে গোল।
বলটি জালে জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যেন সময় কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেলো।
গ্যালারি তখন উন্মত্ত। ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনিতে কাঁপছে মনুমেন্তাল। মাঠের ১০ নম্বর মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে গোলপোস্ট, পেছনে ইতিহাস। আর তার পায়ের নিচে পড়ে আছে জাতীয় দলের হয়ে করা ১২৬তম গোলের স্মৃতি।
হয়তো এ গোলটিও অন্য সব গোলের মতোই ছিলো। কিন্তু এর আবেগ ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা।
কারণ সবাই জানতো—এটাই শেষ।
একজন অধিনায়কের জন্য শেষ আলিঙ্গন
শেষ বাঁশি বাজার পর আর কেউ স্কোরলাইন নিয়ে ভাবেনি। ৩-০ জয় তখন কেবল সংখ্যামাত্র। পুরো মাঠের আলো, ক্যামেরা আর মানুষের চোখ আটকে গেলো মেসির ওপর।
সতীর্থরা তাকে ঘিরে ধরলেন। দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধারা একে একে জড়িয়ে ধরলেন অধিনায়ককে। সে আলিঙ্গনে ছিলো বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ, কোপা আমেরিকার স্মৃতি, পরাজয়ের কষ্ট, একসঙ্গে লড়াই করার অসংখ্য রাত এবং একটি প্রজন্মের ভালোবাসা।
প্রতিপক্ষ বেনিনের খেলোয়াড়রাও এগিয়ে এলেন। ম্যাচ কর্মকর্তারাও জানালেন সম্মান।
ফুটবলের ভাষা আলাদা হতে পারে, জার্সির রং আলাদা হতে পারে, কিন্তু একজন কিংবদন্তির বিদায়ের মুহূর্তে সবাই যেনো একই ভাষায় কথা বলছিলেন—সম্মানের ভাষায়।
মেসির মুখেও তখন আবেগ।
যে মানুষটি মাঠে এত বছর ধরে কোটি মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করেছেন, শেষ রাতে তিনিও যেন নিজের আবেগকে পুরোপুরি সামলাতে পারছিলেন না।
আকাশে লেখা—‘Gracias Leo’
এরপর স্টেডিয়ামের আলো নিভলো। শুরু হলো বিশেষ ড্রোন শো।
আকাশের কালো ক্যানভাসে একে একে ফুটে উঠল আলো। আর শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট হলো দুটি শব্দ—
‘Gracias Leo’
ধন্যবাদ, লিও।
দুটি শব্দের চেয়ে বড় কোনও বিদায়বার্তা হয়তো মেসির জন্য প্রয়োজনও ছিলো না।
কারণ এই ‘ধন্যবাদ’-এর মধ্যে আছে সে শিশুটির গল্প, যে রোজারিও থেকে স্বপ্ন নিয়ে বেরিয়েছিলো। আছে আর্জেন্টিনার সে দীর্ঘ অপেক্ষা, আছে বিশ্বকাপ জয়ের অশ্রু। আছে অসংখ্য রাত জেগে মেসির খেলা দেখা কোটি মানুষের স্মৃতি।
শেষ হলো একটি যুগ
আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচ। ১২৬ গোল। ৭০ অ্যাসিস্ট।
এর সঙ্গে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও অলিম্পিক স্বর্ণপদক। ব্যক্তিগত অসংখ্য অর্জন তো আছেই। কিন্তু মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো সংখ্যায় ধরা যায় না।
তা ধরা যায় মানুষের ভালোবাসায়।
একসময় আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির প্রতিটি ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাকে ঘিরে সমালোচনা হয়েছে। বড় ম্যাচে সাফল্য না পাওয়ার যন্ত্রণা তাকে সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি থামেননি।
বারবার ফিরে এসেছেন।
শেষ পর্যন্ত সে মানুষটিই বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে কাঁদলেন। আর্জেন্টিনার কোটি মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটালেন। তারপর আরও কিছুদিন খেললেন—শুধু ফুটবলের আনন্দের জন্য, দেশের জার্সির প্রতি ভালোবাসা থেকে।
আর মঙ্গলবার রাতে এসে বললেন—এবার থামার সময়।
মেসি থাকবেন, জার্সি থাকবে
শেষ বাঁশি বেজেছে। মেসি মাঠ ছেড়েছেন। জাতীয় দলের জার্সি আর গায়ে জড়াবেন না তিনি।
কিন্তু গল্পটা শেষ হয়নি।
কারণ কিছু মানুষ মাঠ থেকে বিদায় নিলেও ফুটবল থেকে কখনও বিদায় নেন না। তারা হয়ে যান স্মৃতি, হয়ে যান গল্প, হয়ে যান একটি প্রজন্মের আবেগ।
লিওনেল মেসিও তেমনই একজন।
হয়তো কোনও একদিন নতুন প্রজন্মের কোনো শিশু ফুটবল হাতে নিয়ে প্রশ্ন করবে—‘মেসি কে?’
তখন কেউ হয়তো বলবে—
একজন ছিলেন, যিনি বল পায়ে নিলে পুরো পৃথিবী কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে যেতো।
একজন ছিলেন, যিনি আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন।
একজন ছিলেন, যাঁর বাঁ পায়ের জাদু দেখে কোটি মানুষ ফুটবলকে নতুন করে ভালোবেসেছিলো।
তিনি লিওনেল মেসি।
মঙ্গলবার রাতে শেষ বাঁশি বেজেছে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের। কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে তার গল্পের শেষ বাঁশি কখনও বাজবে না।
শেষ ম্যাচে গোল করেছেন মেসি। শেষবারের মতো সতীর্থদের ভালোবাসায় ভেসেছেন। আকাশে লেখা হয়েছে—‘Gracias Leo’।
আর কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় থেকে একই শব্দ ভেসে উঠেছে—
ধন্যবাদ, লিও।
অসংখ্য স্মৃতির জন্য ধন্যবাদ।
সবার দেশ/এমকেজে




























