অবরোধের ফাঁক গলে তেলের স্রোত
বৈশ্বিক বাজারে চাপ কমাচ্ছে ইরানের ‘গোপন রফতানি’
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ-অবরোধ এবং নজরদারির মাঝেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে ইরান। স্যাটেলাইট চিত্র ও শিপিং ট্র্যাকার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি অন্তত ৪৬ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রফতানির জন্য লোড করেছে, যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল ইতোমধ্যেই অবরোধ বলয় অতিক্রম করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ রফতানির পেছনে রয়েছে অত্যন্ত কৌশলী শিপিং পদ্ধতি। নজরদারি এড়াতে একাধিক তেলবাহী ট্যাঙ্কার তাদের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে ‘ডার্ক শিপিং’ কৌশলে চলাচল করছে। ভৌগোলিকভাবে হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন উত্তর উপকূলে অবস্থান করায় এ পদ্ধতি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছে তেহরান।
এ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। ইরানের তেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি—এ বার্তা ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। প্রেডিকশন মার্কেটের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ এপ্রিলের মধ্যে তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ২ শতাংশ থেকে নেমে ১.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, সরবরাহ অব্যাহত থাকায় বাজারে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিলো, তা অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে।
এদিকে উত্তেজনাপূর্ণ এ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়ছে। বদর আল বুসাউদি, ওমান-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রী, নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আটক নাবিকদের মুক্তির লক্ষ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে মিখাইল উলিয়ানভ, ভিয়েনায় নিযুক্ত রুশ প্রতিনিধি, ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞাকে সরাসরি ‘ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে নতি স্বীকার করানো সম্ভব নয়।
তেহরান কেবল রফতানিই বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে শক্ত বার্তাও দিচ্ছে। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে জানিয়েছেন, তেল অবকাঠামোর ওপর কোনও হামলা হলে তারা ‘প্রতিসাম্যের বাইরে’ গিয়ে পাল্টা জবাব দেবে। তার ভাষায়, একটি স্থাপনায় আঘাত এলে চারটি লক্ষ্যবস্তুতে প্রতিঘাত করা হবে।
এ প্রসঙ্গে দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের হাতে এখনও শক্তিশালী ‘এনার্জি কার্ড’ রয়েছে। বাব আল-মান্দেব, হরমুজ প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও পাইপলাইন নেটওয়ার্কের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চায়।
তবে বাইরের এ দৃশ্যপটের বিপরীতে দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। দীর্ঘদিনের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে ডিজিটাল খাতে প্রতিদিন প্রায় ৩১ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছে NetBlocks। প্রায় দুই মাস ধরে চলা এ অচলাবস্থা ইরানের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরান শিগগিরই বড় অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে। তবে বাস্তব শিপিং ডেটা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, যতদিন পর্যন্ত বিকল্প উপায়ে ইরান তেল বাজারে পৌঁছাতে পারবে, ততদিন বৈশ্বিক তেলের বাজার পুরোপুরি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার আশঙ্কা কম থাকবে।
সবার দেশ/কেএম




























