ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ উপেক্ষা, আইনি লড়াইয়ে নতুন মোড়
মাদুরোর পক্ষে রায় দিলো নিউ ইয়র্ক আদালত
যুক্তরাষ্ট্রের কড়া নিষেধাজ্ঞা নীতির মাঝেও বিচারিক স্বাধীনতার এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে নিউইয়র্কের আদালত। ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো-এর আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পথ খুলে দিয়ে কার্যত ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থানকে আংশিকভাবে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
গত শুক্রবার আদালতের নথিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ টানাপোড়েন শেষে ওয়াশিংটন তাদের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় শিথিলতা আনতে সম্মত হয়েছে। ফলে ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকার এখন মাদুরোর আইনজীবীদের ফি পরিশোধ করতে পারবে। এর মাধ্যমে ঝুলে থাকা মাদক পাচার মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া সচল রাখার পথ সুগম হলো।
এর আগে নিষেধাজ্ঞার কারণে মাদুরোর পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ ও অর্থ পরিশোধের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিলো। এতে পুরো মামলাটি খারিজ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক আসামির নিজের পছন্দের আইনজীবী পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক নাটকীয় অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস-কে গ্রেফতার করে। পরে তাদের নিউইয়র্কে এনে নার্কো-টেরোরিজমসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। বর্তমানে তারা ব্রুকলিনের একটি কারাগারে বন্দি রয়েছেন এবং আদালতে নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
মাদুরোর প্রধান আইনজীবী ব্যারি পোল্যাক ফেব্রুয়ারিতে ম্যানহাটনের জেলা জজ আলভিন হেলারস্টাইন-এর কাছে মামলাটি খারিজের আবেদন করেছিলেন। তার যুক্তি ছিলো, নিষেধাজ্ঞার কারণে আইনজীবীর ফি পরিশোধ না করতে পারা একজন আসামির সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। বিশেষ করে মার্কিন সংবিধানের ষষ্ঠ সংশোধনী অনুযায়ী, আসামির পছন্দমতো আইনজীবী নিয়োগের অধিকার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শুনানিতে বিচারক হেলারস্টাইন সরাসরি মামলা খারিজ না করলেও সরকারের অবস্থান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনও ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করে আবার তার আত্মপক্ষ সমর্থনের পথ রুদ্ধ করা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অন্যদিকে, প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে কৌঁসুলি কাইল উইরশবা যুক্তি দেন, ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতির অংশ। তবে বিচারক পাল্টা মন্তব্যে বলেন, মাদুরো বর্তমানে মার্কিন হেফাজতে এবং তিনি আর জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি নন। এ পর্যায়ে তার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করাই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
এ পর্যবেক্ষণের পরই শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসন নিষেধাজ্ঞায় নমনীয়তা আনতে বাধ্য হয় বলে মনে করা হচ্ছে। আদালতের এ সিদ্ধান্তে মাদুরোর আইনি লড়াইয়ে নতুন গতি এলেও, মামলার রাজনৈতিক গুরুত্ব ও আন্তর্জাতিক প্রভাব এখনও বহাল রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রথম মেয়াদ থেকেই মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় যুক্তরাষ্ট্র। দুর্নীতি, নির্বাচনী জালিয়াতি ও মাদক পাচারের অভিযোগে ধারাবাহিকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ২০২০ সালে মাদুরোর বিরুদ্ধে পুরস্কার ঘোষণা ও গ্রেফতারের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক চরম উত্তেজনায় পৌঁছে।
অন্যদিকে, মাদুরো শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন। তার মতে, ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতেই এ মামলা সাজানো হয়েছে।
নিউইয়র্কের আদালতের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব যতই তীব্র হোক, বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাংবিধানিক অধিকার প্রশ্নে আপস করতে রাজি নয় যুক্তরাষ্ট্রের আদালত। এখন দেখার বিষয়, এ বহুল আলোচিত মামলার চূড়ান্ত পরিণতি কোন দিকে গড়ায়।
সূত্র: রয়টার্স
সবার দেশ/কেএম




























