লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায়
জন্মশহরে চিরনিদ্রায় শায়িত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি
আধুনিক ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী এবং প্রভাবশালী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। সপ্তাহব্যাপী চলা ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন শোকযাত্রা শেষে তার জন্মশহর এবং দেশটির অন্যতম পবিত্র ধর্মীয় স্থান মাশহাদে তাকে দাফন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে মাশহাদের ঐতিহ্যবাহী অষ্টম শিয়া ইমাম ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারে এ কিংবদন্তি নেতার দাফন সম্পন্ন হয়।

এর আগে গেল ২৮ ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় তিনি নিহত হন। নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইরাকে বিদায় অনুষ্ঠানের বিপুল জনসমাগমের কারণে সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন এনে স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় ইমাম রেজা স্ট্রিট থেকে জানাজার মূল শোভাযাত্রাটি শুরু করা হয়েছিলো।
জন্মশহরে লাখো মানুষের ঢল ও বিদেশি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই মাশহাদের রাস্তায় নামে হাজার হাজার শোকাহত মানুষের ঢল। ইরানের জাতীয় পতাকা, খামেনির ছবি এবং বৈপ্লবিক স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে তারা প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এ শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ইরানের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ছাড়াও ৪৩টির বেশি দেশের রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং ৯০টিরও বেশি দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে নাইজেরিয়ার শিয়া সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী নেতা শেখ ইব্রাহিম জাকজাকিও মাশহাদের অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

মাশহাদে দাফনের আগে আয়াতুল্লাহ খামেনির লাশ ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় নেয়া হয়েছিলো। ইরাকি কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নাজাফে হযরত আলী (আ.)-এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে প্রায় ৩৮ লাখ মানুষ তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে ঐতিহ্যবাহী আরবাঈন রুট হয়ে লাশ কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.) ও হযরত আব্বাস (আ.)-এর মাজারে নিয়ে যাওয়া হয়, যা শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্যে এক অনন্য প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতি ও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে স্লোগান
এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি নির্বাচিত হলেও তিনি এ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জনসমক্ষে আসেননি। ইরানি বিভিন্ন সূত্রের দাবি, গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় মোজতবা খামেনি নিজেও গুরুতর আহত হন। তার মুখমণ্ডল বিকৃত হওয়াসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে মারাত্মক জখম হওয়ায় তিনি এখনও নিবিড় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং শারীরিক অবস্থার কারণে তিনি কোনও ছবি, ভিডিও বা অডিও প্রকাশ না করে কেবল লিখিত বার্তার মাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন।

দাফন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া উত্তেজিত জনতার একাংশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিশোধমূলক স্লোগান দেন। অনেকের হাতে ‘কিল ট্রাম্প’ লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায় এবং তারা খামেনি হত্যার চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও বর্ণাঢ্য জীবনগাথা
১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল মাশহাদ শহরের এক সাধারণ ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেয়া আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কৈশোরেই ধর্মীয় শিক্ষায় দীক্ষিত হন। পরে উচ্চতর শিক্ষার জন্য কোমে যান। ষাট ও সত্তরের দশকে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গোপন আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি বহুবার গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লবের পর তিনি নতুন শাসনব্যবস্থায় উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে এক বোমা হামলায় তার ডান হাত স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। সে বছরই তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

১৯৮৯ সালে ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনি দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তার দীর্ঘ শাসনামলে তিনি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বহু সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। ১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থী মোহাম্মদ খাতামির উত্থান, ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর গ্রিন মুভমেন্টের বিক্ষোভ এবং ২০২২ সালে মাসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট গণ-অসন্তোষ ছিলো তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিরোধ অক্ষ ও শেষ মুহূর্তের ভূ-রাজনীতি
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খামেনির সবচেয়ে বড় কৌশলগত অর্জন ছিলো মধ্যপ্রাচ্যে একটি শক্তিশালী ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ গড়ে তোলা। সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনের বিভিন্ন সশস্ত্র ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি সামরিক ও আদর্শিক মজবুত সম্পর্ক তৈরি করেন। ২০১৫ সালে পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি হলেও ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে ইসরায়েলের বুকে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ইরানে বড় ধরনের বিমান হামলা চালায়। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ‘অপারেশন রোরিং লায়নের’ অধীনে ৯ শতাধিক বিমান হামলা চালিয়ে যৌথ বাহিনী ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করে, যার ফলে খামেনির দীর্ঘ ৩৭ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তার মৃত্যুর পর দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) পূর্ণ সমর্থনে তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























