ইসরায়েলের ক্ষমতার চাবিকাঠি কি আরব দলগুলোর হাতে?
নেসেটের ৬১ আসনের সমীকরণে আরব দলগুলোর গুরুত্ব, সরকার গঠনে বাড়তে পারে দর-কষাকষির ক্ষমতা।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দলগুলোর ভূমিকা আবারও আলোচনায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে বিকল্প সরকার গঠনের আলোচনায় আরব রাজনীতিকদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ পরিস্থিতিতে রা’আমের নেতা মনসুর আব্বাস এবং আরব রাজনৈতিক জোটের নেতা ইউসুফ জাবারিনের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য জেরুজালেম পোস্ট’-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেশটির আরব রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল, সরকারে অংশগ্রহণের প্রশ্ন এবং ইহুদি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
তবে সরকার গঠনের চাবিকাঠি পুরোপুরি দুই নেতার হাতে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল, বিভিন্ন দলের আসনসংখ্যা এবং সম্ভাব্য জোটের অবস্থান বিবেচনা করা প্রয়োজন।
৬১ আসনের সমীকরণে আরব দলগুলোর গুরুত্ব
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য সাধারণত অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন। ফলে কোনও জোট এ সংখ্যায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে ছোট দলগুলোর সমর্থনও সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের পূর্বাভাসে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। কয়েকটি চ্যানেলের হিসাবে জোটটি প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পিছিয়ে থাকলেও চ্যানেল ১৪-এর হালনাগাদ পূর্বাভাসে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছিলো।
এসব পূর্বাভাসকে চূড়ান্ত নির্বাচনী ফল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। প্রকৃত ফলাফল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সমঝোতাই নির্ধারণ করবে, কোন দল সরকার গঠনের ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।
ইসরায়েলের আরব নাগরিকেরা দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ভোট দেন এবং আরব দলগুলোও সংসদীয় রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্ব করে। তাদের আসনসংখ্যা ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন, বাজেট অনুমোদন কিংবা সংসদীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব বাড়তে পারে।
মনসুর আব্বাসের কৌশল: আগে সরকার, পরে শর্ত
রা’আমের নেতা মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের রাজনীতিতে বাস্তববাদী সমঝোতার কৌশল অনুসরণের জন্য পরিচিত। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনে তার দলের অংশগ্রহণ ছিলো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ওই সরকারের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কোনও স্বতন্ত্র আরব দল ইসরায়েলের ক্ষমতাসীন জোটে সরাসরি অংশ নেয়।
নির্বাচনের রাতে আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে গাদি আইজেনকটের দেয়া শর্ত নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আব্বাসের বক্তব্যের সারকথা ছিলো—প্রথমে দেখতে হবে সরকার গঠনের বাস্তব সম্ভাবনা আছে কি না, এরপর আলোচনা হতে পারে শর্ত নিয়ে।
এ অবস্থান থেকে বোঝা যায়, আব্বাসের রাজনৈতিক কৌশলে সম্ভাব্য সরকার গঠনে অংশগ্রহণ এবং আরব নাগরিকদের স্বার্থে নীতিগত সুবিধা আদায়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে সরকারে অংশ নেয়ার বিনিময়ে কী ধরনের শর্ত তিনি দেবেন, কোন বিষয়ে আপস করবেন এবং তার সমর্থকেরা সে সমঝোতা কতটা গ্রহণ করবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে নির্বাচনী পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক আলোচনার ওপর।
ইউসুফ জাবারিনের অগ্রাধিকার কী?
আরব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সরকারে সরাসরি অংশগ্রহণের প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়েছে। মনসুর আব্বাসের রা’আম সরাসরি সরকারে যোগ দেয়ার বিষয়ে তুলনামূলকভাবে আগ্রহী। অন্যদিকে, হাদাশ, তা’আল ও বালাদকে ঘিরে গঠিত জয়েন্ট লিস্টের অবস্থান হলো, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বিকল্প সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি হলে নির্দিষ্ট শর্তে বাইরে থেকে সমর্থন দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রতিবেদনে ইউসুফ জাবারিনের পক্ষ থেকে অপরাধ দমনে অর্থায়ন ও নজরদারিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের দাবি এবং যুদ্ধ ও বসতি স্থাপনের বাজেটের মতো বিষয়ে সীমারেখা নির্ধারণের প্রসঙ্গ এসেছে।
এ ধরনের শর্তের লক্ষ্য হতে পারে আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অপরাধ দমন, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সরকারি সম্পদের বণ্টনে অগ্রাধিকার আদায় করা। একই সঙ্গে ইসরাইলের সামরিক নীতি ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলোতে আরব দলগুলোর আপত্তিও জোট আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে।
তবে জাবারিনের অবস্থানকে আব্বাসের কৌশলের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। একজন সরকারে সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী, অন্যদিকে অন্য পক্ষের কৌশল হতে পারে নির্দিষ্ট নীতিগত শর্ত পূরণ না হলে বাইরে থেকে সমর্থন দেয়া।
আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট নিয়ে ইহুদি নেতাদের মতভেদ
ইসরাইলের ইহুদি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের প্রশ্নে ঐকমত্য নেই।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে এক সাক্ষাৎকারে গাদি আইজেনকট সম্ভাব্য জোটসঙ্গীদের জন্য কয়েকটি শর্ত তুলে ধরেন। এর মধ্যে ছিলো ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধ মেনে চলা, নাগরিক দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা স্বীকার করা এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে সংগঠনটির বিলুপ্তির পক্ষে অবস্থান নেয়া।
আইজেনকটের মতে, আরব দলগুলো এসব শর্ত পূরণ করছে না। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরে তিনি আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেন।
অন্যদিকে, ২০২১ সালে রা’আমকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করা নাফতালি বেনেটও একই ধরনের জোট পুনর্গঠনের বিরোধিতা করছেন। তার আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে রা’আমের অ-জায়নবাদী রাজনৈতিক পরিচয়। বিপরীতে, ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়ার গোলান সরকারে রা’আমকে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
এ মতভেদ দেখায়, নেতানিয়াহুবিরোধী অবস্থান থাকলেই সব রাজনৈতিক দল একটি অভিন্ন সরকার গঠনে সম্মত হবে, এমন নয়।
রা’আমে ইহুদি রাজনীতিকের যোগদান: নতুন বার্তা?
রা’আমের সঙ্গে ইহুদি রাজনীতিক ইয়োভ সেগালোভিচের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তিনি ইয়েশ আতিদ দলের সাবেক আইনপ্রণেতা এবং ইসরাইলের জাতীয় অপরাধ তদন্ত ইউনিটের নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শিকড় থাকা একটি আরব দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা দলটির রাজনৈতিক পরিসর, আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক অবস্থান এবং সম্ভাব্য জোটসঙ্গীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে ক্ষমতার চাবিকাঠি?
ইসরাইলের সরকার গঠনের প্রশ্নে মনসুর আব্বাস ও ইউসুফ জাবারিনের মতো আরব নেতাদের গুরুত্ব নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, নির্বাচনে তাদের দলগুলো কতটি আসন পায়। দ্বিতীয়ত, নেতানিয়াহুর জোট কিংবা বিকল্প কোনও জোট ৬১ আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারে কি না। তৃতীয়ত, সম্ভাব্য জোটসঙ্গীরা আরব দলগুলোর শর্ত মেনে নিতে কতটা প্রস্তুত।
আরব দলগুলোর মধ্যে সরকারে সরাসরি অংশগ্রহণ, বাইরে থেকে সমর্থন এবং নির্দিষ্ট নীতিতে আপস না করার বিষয়ে মতপার্থক্য থাকায় তাদের সমর্থন এককভাবে কোনও একটি রাজনৈতিক শিবিরের পক্ষে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
সুতরাং ইসরাইলের ক্ষমতার চাবিকাঠি মনসুর আব্বাস ও ইউসুফ জাবারিনের হাতে কি না, তার উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেয়া যায় না। তবে নির্বাচনী ফলাফল যদি কোনও জোটকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দূরে রাখে, তাহলে আরব দলগুলোর সমর্থন ও রাজনৈতিক শর্ত সরকার গঠনের আলোচনায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট
সবার দেশ/এমকেজে




























