Sobar Desh | সবার দেশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০০:১৩, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব

ইসরায়েলকে চাপে রাখতে ঐক্যবদ্ধ ইউরোপ

ইসরায়েলকে চাপে রাখতে ঐক্যবদ্ধ ইউরোপ
ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলের দখলকৃত পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করতে একযোগে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপের একাধিক দেশ। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার নেতৃত্বে নেয়া এ উদ্যোগে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইডেনও সমর্থন জানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের ক্রমবর্ধমান দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা শুধু পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলো থেকে পণ্য আমদানি সীমিত করার উদ্যোগই নেয়নি; বসতি স্থাপন কার্যক্রমে সহায়তা, অর্থায়ন বা সেখান থেকে মুনাফা করে এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার কথা জানিয়েছে।

দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে পশ্চিম তীরের কৌশলগত এলাকা ই১-এ নতুন ইসরায়েলি বসতি নির্মাণের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ ভবিষ্যতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

অর্থনৈতিক চাপ তৈরির সম্ভাবনা

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম তীরের বসতিগুলো থেকে আসা পণ্য ইসরায়েল ও যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক বাণিজ্যের তুলনায় খুব বড় অংশ নয়। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। তবে পশ্চিম তীরের পৃথক বসতিগুলোর অর্থনীতিতে খেজুর, ওয়াইন ও প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন পণ্যের আয় এবং ইসরায়েলি সরকারি ভর্তুকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলবিষয়ক সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল সি. কার্টজার বলেন, বসতিগুলোর পণ্য আলাদাভাবে চিহ্নিত করা বা সেগুলোর ওপর বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপের আলোচনা বহুদিনের হলেও বাস্তবে খুব কম পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এবার নেয়া পদক্ষেপ বসতি আন্দোলন ও বসতি সম্প্রসারণকে সমর্থনকারী যেকোনও ইসরায়েলি সরকারের ওপর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তবে ব্যক্তি ও কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কোনও ইসরায়েলি ব্যাংক যদি পশ্চিম তীরে বসতি নির্মাণে ঋণ দেয়ার পাশাপাশি ইসরায়েলের অন্যান্য অঞ্চলেও স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাহলে নিষেধাজ্ঞার আওতা নির্ধারণ করা কঠিন হতে পারে।

ব্রিটেনের অবস্থানে বড় পরিবর্তন

ইসরায়েলের প্রতি ব্রিটেনের সাম্প্রতিক অবস্থান পরিবর্তন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করে চলেছে লন্ডন। কিন্তু গাজা যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশ অবস্থান তুলনামূলকভাবে কঠোর হয়েছে।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড পার্লামেন্টে নিজেকে ‘গর্বিত ব্রিটিশ ইহুদি’ ও ইসরায়েলের সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করলেও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ‘জাতিগত নির্মূল’ হচ্ছে। ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় ব্রিটেন নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইসরায়েলের পাল্টা পদক্ষেপ

ইউরোপীয় দেশগুলোর সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। ব্রিটেনের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট জেনারেল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে দেশটি। ১৮৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কনস্যুলেট জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজায় ব্রিটিশ স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।

এ ছাড়া কয়েকজন ব্রিটিশ এমপির ইসরায়েলে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটেনের সহযোগিতাও বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে গাজায় ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ থেকেও ব্রিটেনকে বাদ দিয়েছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের প্রতি ‘শত্রুতাপূর্ণ’ আচরণের অভিযোগ এনে বলেন, এমন পদক্ষেপের জবাব দেয়া ছাড়া তাদের সামনে কোনও পথ ছিলো না।

তবে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে একই ধরনের কূটনৈতিক পাল্টা ব্যবস্থা নেয়নি ইসরায়েল। এর আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগে নেতৃত্ব দেয়ায় ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের দূরত্ব বাড়ছে

ইউরোপের সমন্বিত এ পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ব্রিটেনের পথ অনুসরণ করবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের মতো দেশের ক্ষেত্রে এমন অবস্থান খুব বেশি বিস্ময়কর নয়। তবে ঐতিহাসিকভাবে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ব্রিটেন একই পথে এগিয়ে যাওয়ায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

একই সঙ্গে নয়টি ইউরোপীয় দেশের সমর্থন পাওয়ায় ইসরায়েলের পক্ষে প্রতিটি দেশের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে এটি কয়েকটি দেশের বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তের পরিবর্তে ইসরাইলি বসতি নীতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর ইউরোপীয় অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বাস্তবায়নেই বড় চ্যালেঞ্জ

তবে সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই এর পুরো অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা যাবে না। নতুন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার জন্য জাতীয় আইন প্রণয়ন এবং ইউরোপীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় বিধি তৈরিতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে কোনও পণ্য বা সেবা সরাসরি বসতি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত, তা শনাক্ত করে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করাও জটিল হবে।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ড্যানিয়েল লেভির মতে, ব্রিটেন এবার এমন একটি ক্ষেত্র তৈরি করছে, যেখানে কেবল রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, বাস্তব নীতিগত পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে। তার মতে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজের প্রভাব ও নেতৃত্বের সক্ষমতা আরও বাড়াচ্ছে।

তবে ব্রিটিশ নীতির সমালোচনাও রয়েছে। লেবার দলের হাউস অব লর্ডসের সদস্য জন মেন্ডেলসন মনে করেন, ইসরায়েল ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ব্রিটিশ নীতি ক্রমেই কৌশলের পরিবর্তে ঘোষণানির্ভর হয়ে পড়ছে। এতে ইসরায়েলের ওপর ব্রিটেনের প্রভাব কমে যেতে পারে এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাও দুর্বল হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

সব মিলিয়ে, পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলোকে ঘিরে ইউরোপের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ কেবল বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে এটি ইউরোপের নীতিগত অবস্থানের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে ইসরায়েল ও তার দীর্ঘদিনের পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়তে পারে।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

সবার দেশ/কেএম

শীর্ষ সংবাদ:

হরমুজে মার্কিন ড্রোন-সাবমেরিন জব্দের দাবি ইরানের
মেসির পর আর্জেন্টিনার নতুন অধিনায়ক রোমেরো
ধাপে ধাপে ঠকছেন মালদ্বীপের প্রবাসীরা: হাসনাত
এক ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যের ৬ দেশে ভ্রমণ
মেট্রোরেলের ৪৬ পিলারে ফাটল, ২৭ বিয়ারিং প্যাড ঝুঁকিপূর্ণ: সংসদে সড়কমন্ত্রী
রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে আগুন, তদন্তে কমিটি
সরকারও আশির দশকে ফিরতে চাইছে: নাহিদ
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে তিন দিনে ১০৪০ কোটি টাকা ফেরত
ইসরায়েলকে চাপে রাখতে ঐক্যবদ্ধ ইউরোপ
খোকনের ওই আচরণ সঠিক ছিলো না: আইনমন্ত্রী
আমাকে ভেঙে ফেলা এতো সহজ নয়: বাঁধন
আমিরাতকে হারিয়ে সেমিফাইনালে বাংলাদেশ
ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের যোগদানের কোনও তথ্য নেই: ভারত
স্ত্রীকে মেয়ে-ভাতিজি সাজিয়ে বিয়ে, দম্পতি গ্রেফতার
আওয়ামী লীগ ‘ক্লোজড চ্যাপ্টার’: সারজিস আলম