রাষ্ট্রপতি থেকে মন্ত্রিসভায় আসতে পারে একাধিক পরিবর্তন
ছয় মাস পূর্তিতে সরকারে বড় রদবদলের ইঙ্গিত
বর্তমান বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে আগামী ১৬ আগস্ট। সরকার গঠনের পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন, ছয় মাস শেষে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা হবে। সে সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রাক্কালে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল, দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং নতুন মুখ অন্তর্ভুক্তির জোর আলোচনা চলছে।
সরকারের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মসম্পাদন, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অগ্রগতি, জনসেবার মান, প্রশাসনিক সমন্বয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও প্রতিটি মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কার্যক্রম নিয়ে পৃথক প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও বিভিন্ন মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করছেন বলে জানা গেছে।
সূত্রগুলো বলছে, এ মূল্যায়নের ভিত্তিতেই কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দফতর পরিবর্তন করা হতে পারে। একই সঙ্গে কেউ কেউ মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়তে পারেন, আবার কয়েকজন নতুন মুখও যুক্ত হতে পারেন।
এদিকে সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হওয়ার পর নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—এ প্রশ্নও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নতুন রাষ্ট্রপতি করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
দলটির একাধিক সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের ক্ষমতা বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দিয়েছে। তিনি ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন বলেও সূত্রের দাবি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে তার বর্তমান দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম আলোচনায় রয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে বর্তমান প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে দায়িত্ব দেয়া হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে উপদেষ্টা হিসেবে ড. মাহ্দী আমিন অথবা রুহুল কবির রিজভীর নামও বিবেচনায় রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
জাতীয় সংসদের উপনেতার পদেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ পদে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও দেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। সে ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্য থেকে কাউকে প্রতিমন্ত্রী করার চিন্তাভাবনাও রয়েছে।
সরকারি মূল্যায়নে দেখা গেছে, একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন মন্ত্রী অতিরিক্ত দায়িত্বের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল দেখাতে পারেননি। এজন্য ভবিষ্যতে একজন মন্ত্রীর অধীনে একটি মন্ত্রণালয় রাখার নীতির দিকেই ঝুঁকছে সরকার।
বর্তমানে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বাণিজ্য, শিল্প এবং পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। শেখ রবিউল আলমের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ, রেল মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এছাড়া কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশীদ ইয়াছিনও একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।
সূত্রের দাবি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষক কার্ড কর্মসূচির অগ্রগতি এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সন্তুষ্ট নন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অনিয়ম এবং বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ সরকারের উচ্চপর্যায়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এ কারণে কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশীদ ইয়াছিন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর দায়িত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। টুকুকে শিল্প কিংবা রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের দফতর পরিবর্তন অথবা তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। এছাড়া সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক, পানিসম্পদ এবং তথ্য মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাহাড়ি অঞ্চল থেকে একজন পূর্ণমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে পদোন্নতি পেতে পারেন কয়েকজন প্রতিমন্ত্রী। তাদের মধ্যে রয়েছেন পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল এবং প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। তাদের কয়েকজনকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, জোটসঙ্গী বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. শহীদুল ইসলাম বাবুল, জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল এবং মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মদ অপুর নাম আলোচনায় রয়েছে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে ড. মাহ্দী আমিন, রেহান আসিফ আসাদ, হুমায়ন কবির ও ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে নবনির্বাচিত কয়েকজন সংসদ সদস্যকে উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। তারা স্থানীয় সরকার, সড়ক পরিবহন, অর্থ, রেল এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পেতে পারেন।
অন্যদিকে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং ড. আব্দুল মঈন খানের মতো যাদের মন্ত্রিসভায় স্থান হয়নি, তাদের জাতীয় সংসদের বিভিন্ন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য এ রদবদল বা নিয়োগসংক্রান্ত কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়নি। ফলে সব আলোচনা আপাতত রাজনৈতিক ও সরকারি সূত্রনির্ভর সম্ভাবনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
সবার দেশ/কেএম




























