সুর থেমে গেলো, রয়ে গেলো অমর কণ্ঠ
কিংবদন্তি গায়িকা আশা ভোঁসলে আর নেই
ভারতীয় সংগীতাঙ্গনের এক অনন্য অধ্যায়ের অবসান হলো। উপমহাদেশের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলে আর নেই। রোববার (১২ এপ্রিল) মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৯২ বছর।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায় শনিবার রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেয়া হয়। রোববার দুপুরে তার ছেলে আনন্দ ভোঁসলে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।
গত কয়েক মাস ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতায় ভুগছিলেন আশা ভোঁসলে। শনিবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাকে পর্যবেক্ষণে রাখেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর তাকে ফিরিয়ে আনা যায়নি। সোমবার মুম্বাইয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
১৯৩৩ সালে মহারাষ্ট্রের সংগীতময় মঙ্গেশকর পরিবারে জন্ম নেয়া আশা ভোঁসলে ছোটবেলা থেকেই গানকে জীবনের অংশ করে নেন। মাত্র ৯ বছর বয়সে পেশাদার গানের জগতে প্রবেশ করেন তিনি। ১৯৪৩ সালে প্রথম চলচ্চিত্রে গান রেকর্ড করার পর ধীরে ধীরে বলিউডে নিজের স্বতন্ত্র আসন গড়ে তোলেন। বড় বোন কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকরের বিশাল জনপ্রিয়তার মধ্যেও নিজস্ব কণ্ঠভঙ্গি, বৈচিত্র্যময় গায়কী এবং সাহসী পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন এক স্বতন্ত্র মহিমার শিল্পী।
আশা ভোঁসলের কণ্ঠে রোমান্টিক গান, গজল, কাওয়ালি, পপ, শাস্ত্রীয়, লোকসংগীত—সব ধারাই পেয়েছে নতুন মাত্রা। ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’, ‘মেরা কুছ সামান’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ‘পিয়া তু আব তো আজা’—এমন অসংখ্য কালজয়ী গান তাকে এনে দেয় অমরত্ব। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি সাতবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ভারতের পদ্মবিভূষণসহ বহু সম্মানে ভূষিত হন। ২০১১ সালে ১১ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করার স্বীকৃতিও পান তিনি।
ব্যক্তিজীবনেও ছিলো নাটকীয়তা। অল্প বয়সে গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করলেও সে সম্পর্ক টেকেনি। পরে বিখ্যাত সংগীত পরিচালক আর. ডি. বর্মনের সঙ্গে তার প্রেম ও বিবাহ ভারতীয় সংগীতজগতের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে। আর ডি বর্মণের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা একসঙ্গে ছিলেন।
২০২৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে আধুনিক গান নিয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে গিয়ে আশা ভোঁসলে বলেছিলেন, নতুন প্রজন্মের গান তিনি খুব কম শুনেন; শেখার জন্য এখনও ধ্রুপদী সংগীতই তার ভরসা। সে শিল্পী আজ না থাকলেও তার কণ্ঠে গাওয়া হাজারো গান প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মোহিত করে যাবে।
আশা ভোঁসলের মৃত্যুতে শুধু ভারত নয়, সমগ্র উপমহাদেশ হারাল সংগীতের এক স্বর্ণযুগের জীবন্ত প্রতীক। তার প্রস্থান যেন সুরের আকাশে এক নক্ষত্রপতন—কিন্তু তার কণ্ঠ চিরকাল বেঁচে থাকবে শ্রোতার হৃদয়ে।
সবার দেশ/কেএম




























