Sobar Desh | সবার দেশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০০:৩৯, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশ বিদ্বেষের নতুন অধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গের ৩ জেলার হোটেলে বাংলাদেশিদের প্রবেশ নিষেধ

পশ্চিমবঙ্গের ৩ জেলার হোটেলে বাংলাদেশিদের প্রবেশ নিষেধ
ছবি: সংগৃহীত

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে উত্তেজনার আবহে পশ্চিমবঙ্গে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে ‘বাংলাদেশ বিদ্বেষ’। রাজনৈতিক বক্তব্যের পর এবার সে বিদ্বেষের প্রকাশ ঘটছে সরাসরি বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের তিন জেলা—শিলিগুড়ি, মালদহ ও কোচবিহারে একযোগে হোটেলগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। হোটেলের দেয়ালে ঝুলছে ‘বাংলাদেশিদের প্রবেশ নিষেধ’ লেখা নোটিশ।

হোটেল মালিক সংগঠনগুলোর দাবি, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ হিসেবেই তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সমালোচকদের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনও ঘটনার দায় ভারত বা পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ কিংবা বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের ওপর চাপানো অযৌক্তিক ও বিদ্বেষপ্রসূত।

মালদহে বাংলাদেশিদের জন্য হোটেল বন্ধের খবর প্রথম সামনে আসে বৃহস্পতিবার। এতদিন চিকিৎসা কিংবা শিক্ষাভিসায় আসা বহু বাংলাদেশি মালদহের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মালদহ হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কৃষ্ণেন্দু চৌধুরী জানিয়েছেন, আপাতত জেলার কোনও হোটেলেই বাংলাদেশি নাগরিকদের থাকার অনুমতি দেয়া হবে না। তার যুক্তি, বাংলাদেশ থেকে পাসপোর্ট ও ভিসা সংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ থাকায় হোটেলগুলোও বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

তবে এ ব্যাখ্যা মানতে নারাজ একাংশ। তাদের মতে, ভিসা প্রক্রিয়া বন্ধ থাকলেও যারা বৈধভাবে আগে থেকেই ভারতে অবস্থান করছেন বা চিকিৎসার জন্য এসেছেন, তাদের হোটেল সেবা না দেয়া মানবিক ও আইনি প্রশ্ন তোলে। সমালোচকদের অভিযোগ, এটি মূলত চরম বাংলাদেশ বিদ্বেষ থেকেই নেয়া সিদ্ধান্ত।

একই পথে হেঁটেছে কোচবিহারের হোটেল মালিকরাও। কোচবিহার হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ঘোষণা দিয়েছে, ভারত সরকার বাংলাদেশিদের ভিসা পরিষেবা বন্ধ করায় সংগঠনের আওতাধীন হোটেলগুলোতেও বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পরিষেবা বন্ধ রাখা হবে। সংগঠনের সভাপতি ভূষণ সিংহ বলেন, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী বক্তব্য ও হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং সংগঠনের সকল সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করেই তা কার্যকর করা হয়েছে।

শিলিগুড়িতেও একই চিত্র। শহরের বিভিন্ন হোটেলের দেয়ালে সাঁটানো হচ্ছে ‘বাংলাদেশিদের প্রবেশ নিষেধ’ নোটিশ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৪ সালের নভেম্বরেই শিলিগুড়ি হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের আওতাধীন হোটেলগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকদের জায়গা দেয়া হবে না। সে সময় চিকিৎসা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু ছাড় থাকলেও বর্তমানে সে ছাড়ও পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। সংগঠনের সহ-সম্পাদক উজ্জ্বল ঘোষ জানান, শিলিগুড়িতে সংগঠনের আওতাধীন ১৮০টি হোটেলেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।

এ সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে স্বাগত জানিয়েছে বিজেপি। দলটির নেতাদের মতে, এটি সময়োপযোগী ও নৈতিক অবস্থান। অন্যদিকে, রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস বিষয়টিকে হোটেল মালিকদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছে এবং সরাসরি কোনও রাজনৈতিক অবস্থান নেয়নি।

তবে মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকদের মতে, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটকে কেন্দ্র করে অন্য দেশের নাগরিকদের ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিদ্বেষ বাড়াবে। তারা প্রশ্ন তুলছেন, ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বহু অভিযোগ ও অতীতের দাঙ্গার ঘটনায় যদি একইভাবে প্রতিবাদ হতো, তাহলে হয়তো এ সিদ্ধান্ত কিছুটা গ্রহণযোগ্য মনে হতো। বর্তমান বাস্তবতায় এ নিষেধাজ্ঞা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সামাজিক স্তরে আরও দূরত্ব তৈরি করবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সবার দেশ/কেএম

সর্বশেষ