বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন অশনি সংকেত
ইরান শেষ অস্ত্র হিসেবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করবে!
হরমুজ প্রণালী ঘিরে আবারও ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের মেঘ। ২০২৬ সালের শুরুতেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এ সংকীর্ণ অথচ কৌশলগত জলপথ ঘিরে যেকোনও সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হলে তেহরান হরমুজ প্রণালীকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরকে সংযুক্তকারী এ জলপথ দিয়েই বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চলাচল করে। ফলে এখানে সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা দিতে সক্ষম।
লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপো সতর্ক করে বলেছেন, প্রণালী বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেই বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শুধুমাত্র শঙ্কার কারণেই তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে কয়েক ডলার বেড়ে যেতে পারে। আর যদি কোনোভাবে হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তেলের দাম এক লাফে ১০ থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এমএসটি মারকুইয়ের জ্বালানি গবেষণা প্রধান সল কাভোনিকের মতে, ইরানি প্রশাসন যদি নিজেদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ে মরিয়া সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা কেবল আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের জন্ম দেবে। বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো, যাদের বড় অংশের জ্বালানি সরবরাহ এ রুটের ওপর নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
২০২৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের প্রেক্ষাপটে ইরান হরমুজ প্রণালীকে তাদের সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের শক্তিশালী নৌবহরের উপস্থিতিতে দীর্ঘ সময় ধরে এ জলপথ পুরোপুরি বন্ধ রাখা ইরানের জন্য কঠিন, তবে ড্রোন হামলা, সমুদ্র মাইন স্থাপন কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজে হয়রানির মতো কৌশলের মাধ্যমে বাজারে ভয় ও অস্থিরতা তৈরি করা সম্ভব।
সাম্প্রতিক ভেনিজুয়েলা সংকটের পর আন্তর্জাতিক তেল ব্যবসায়ীরা এখন আরও নিবিড়ভাবে ইরানের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন। ইতোমধ্যে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটলেও তার প্রভাব কেবল তেলের দামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্বজুড়ে পরিবহন ব্যয়, খাদ্যমূল্য এবং সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতির ওপর নেতিবাচক চাপ তৈরি করবে।
ওয়াশিংটন একদিকে যেমন তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনের কূটনৈতিক চেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প জ্বালানি রুট ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে ভাবছে। তবে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না আসা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বিন্দু হিসেবেই রয়ে যাচ্ছে।
সবার দেশ/কেএম




























