প্যারিসে মডেস্ট ফ্যাশনের উত্থান
বৈশ্বিক বাজারে নতুন শক্তি মুসলিম নারীদের পোশাক
১. ফরাসি ব্র্যান্ড সুতুরা’র বক্সি স্ট্রিটওয়্যার। ২. নুর টারবান্সের-এর স্বতন্ত্র মুসলিম-প্যারিসীয় পোশাকে একটি বেরেটের সঙ্গে স্কার্ফ। ৩. হিকরান ওনাল-এর ‘রোমান্টিক’ পোশাকে নীল ও গোলাপি রঙের মিশেল। ৪. অস্ট্রেলিয়ান ডিজাইনার আইসা হাসানের পোশাকে উষ্ণতর আভা।
বিশ্ব ফ্যাশন অঙ্গনে দ্রুত গুরুত্ব বাড়ছে শালীন বা ‘মডেস্ট ফ্যাশন’। এ প্রবণতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল‘মডেস্ট ফ্যাশন উইক’ প্যারিস, যা প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হলো ফ্রান্সের রাজধানীতে। প্রায় ৩০ জন আন্তর্জাতিক ডিজাইনারের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে উঠে আসে ঢিলেঢালা, দীর্ঘ কাটের পোশাক এবং মাথা ঢাকার বিভিন্ন ধরনের স্কার্ফ—যা বহু মুসলিম নারী তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিধান করেন।
অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় প্যারিস শহরের শঁজেলিজের কাছাকাছি অবস্থিত হোটেল লে মারোয়-এ। এ শহরে এমন আয়োজনের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে, কারণ ফ্রান্সে দীর্ঘদিন ধরেই হিজাবসহ ধর্মীয় পোশাক নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক চলে আসছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে রয়েছে বিধিনিষেধও।
নাইজেরিয়ান ব্র্যান্ড ফ্লন্ট আর্কাইভের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর রুকাইয়া কাম্বা বলেন, প্যারিসে তার সংগ্রহ প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত ছিলো সচেতন ও প্রতীকী। অন্যদিকে, আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রধান ওজলেম শাহিন প্যারিসকে ইউরোপের মডেস্ট ফ্যাশনের সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেন।

র্যাম্পে দেখা গেছে প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত নানা রঙ ও নকশা। তুরস্কভিত্তিক ব্র্যান্ড মিহারের প্রতিষ্ঠাতা হিকরান ওনাল তার সংগ্রহে রোমান্টিক ধাঁচের নীল-সবুজ ও গোলাপি রঙের মিশেল তুলে ধরেন। অন্যদিকে নাদা পুসপিতা উপস্থাপন করেন সরল রেখার নকশা, যা মিনিমালিস্ট ধারার প্রতিনিধিত্ব করে।
অস্ট্রেলিয়ান ব্র্যান্ড আসিয়ামের ডিজাইনার আইসা হাসান প্রকৃতি-প্রাণিত গাঢ় সবুজ ও শরৎকালীন রঙের ব্যবহার করেন, যেখানে একটি বালতি টুপির মাধ্যমে তার সাংস্কৃতিক পরিচয়ও ফুটে ওঠে।
তবে শুধু ঐতিহ্যবাহী বা রোমান্টিক ধাঁচ নয়, ফ্যাশন দুনিয়ায় জনপ্রিয় স্পোর্টি ও স্ট্রিটওয়্যার ধারাও ছিলো সমানভাবে উপস্থিত। ফরাসি ব্র্যান্ড সুতুরা এবং নুর টারবান্সের তাদের নকশায় জেন-জেড প্রজন্মের স্ট্রিট স্টাইল তুলে ধরে। নাইলন, কালো ও উজ্জ্বল রঙের ঢিলেঢালা পোশাকে এ ধারা স্পষ্ট, যা জনপ্রিয় করেছে নাইকি ও অ্যাডিডাস।

বিশ্বব্যাপী মডেস্ট ফ্যাশনের বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিনারস্টান্ডার্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এ খাতে বৈশ্বিক ভোক্তা ব্যয় ৪০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে। শুরুতে মুসলিম নারীদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও এখন অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায় ও সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যেও এর চাহিদা বাড়ছে।
ফ্রান্সে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি ‘ল্যাসিতে’-এর কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্কুলে হিজাবসহ ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দুই দশকের বেশি আগে রাষ্ট্রীয় স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে আবায়া পোশাকও নিষিদ্ধ তালিকায় যুক্ত হয়েছে। তবুও এ ফ্যাশন উইক অনেকের কাছে পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে ধরা দিয়েছে।
ফরাসি ডিজাইনার ফাতু দুকুরে বলেন, প্যারিসে নিজের নকশা প্রদর্শন তাকে গর্বিত করেছে এবং এটি প্রমাণ করে—মাথায় স্কার্ফ পরা নারীরাও সমাজে যেকোনও ভূমিকা রাখতে পারেন।

আয়োজনে বুরকিনিও প্রদর্শন করে তুরস্কের ব্র্যান্ড মায়োভেরা বুরকিনি। যদিও ফ্রান্সের বেশিরভাগ পাবলিক সুইমিং পুলে এটি নিষিদ্ধ, তবে সমুদ্রসৈকতে অনুমোদিত রয়েছে।
দর্শকদের মধ্যেও ছিলো ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া। একজন তরুণী জানান, আগে হিজাব পরার কারণে বৈষম্যের শিকার হলেও এমন আয়োজন তাকে নতুন আশাবাদ দিয়েছে। আরেকজন বলেন, ফ্রান্সে হয়তো ধীরে ধীরে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসছে—হিজাব এখন আর শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং ফ্যাশন ও পরিচয়ের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, প্যারিসের এ আয়োজন শুধু একটি ফ্যাশন শো নয়—বরং এটি সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি, পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং বৈশ্বিক ফ্যাশন বাজারে নতুন এক প্রবণতার শক্তিশালী বার্তা বহন করছে।
সবার দেশ/কেএম




























