দ্য হিন্দুকে মির্জা ফখরুল
হাসিনা ইস্যুতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক থামবে না
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো একক ইস্যুতে আটকে থাকা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ভারতের প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য হিন্দুকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বাধা হওয়া উচিত নয়।
গুলশানে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে দেয়া ওই সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে এবং দেশে তাকে বিচারের আওতায় আনার জনদাবি আছে। সে কারণে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো ভারতের নৈতিক দায়িত্ব বলে বিএনপি মনে করে। তবে ভারত যদি তাকে হস্তান্তর না-ও করে, তবুও বাণিজ্যসহ বৃহত্তর সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সেটি প্রতিবন্ধক হওয়া উচিত নয়।
তিনি জানান, শেখ হাসিনা ও তার সরকারের সাবেক মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানকালে হত্যাকাণ্ড ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে যে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা চলমান থাকবে। গত ১৭ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার একাধিকবার অনুরোধ জানালেও দিল্লি এ বিষয়ে কোনো সাড়া দেয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে জটিলতা আছে স্বীকার করে মির্জা ফখরুল বলেন, জটিলতা থাকা মানেই সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কেও নানা টানাপোড়েন আছে, কিন্তু তারা পারস্পরিক স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের ক্ষেত্রেও একটি ইস্যুতে আটকে না থেকে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নেয়া প্রয়োজন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ভারতে অবস্থান করছিলেন। সে সময়ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ভারত সফর করেছিলেন। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইও ঢাকায় এসেছিলেন। ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে জিয়াউর রহমান দিল্লি সফরে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এটিকে তিনি রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
দুই দেশের অমীমাংসিত ইস্যু নিয়েও কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি আগামী বছরের মধ্যে নবায়নের বিষয় সামনে আসবে। ফারাক্কার পানিবণ্টন, সীমান্তে হত্যা এবং অন্যান্য সংবেদনশীল ইস্যু আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। তার ভাষায়, ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়। যারা যুদ্ধের কথা বলে, তারা বাস্তবতা বিবর্জিত কথা বলে।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়েও মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা উচিত। প্রতিশোধ ও সহিংসতার মনোভাব গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ২০২৪ সালের আগস্টের সহিংস অভ্যুত্থানের পর জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর সমঝোতা গড়ে উঠতে পারেনি বলেও তিনি দাবি করেন। তার মতে,
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছিলো অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারীদের সিদ্ধান্তে।
বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিকে তিনি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক জোরদারের সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি, বাণিজ্য, ব্যবসা সম্প্রসারণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
প্রযুক্তি শিক্ষায় ভারতের সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক বেকার তরুণকে দক্ষ করে তুলতে হবে। এতে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোসহ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আরও বেশি সুযোগ পেতে পারে।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা নিয়েই নতুন সরকারকে কাজ শুরু করতে হবে। বিভিন্ন মেগা প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করে দেখতে হবে কোথায় অপচয় হয়েছে। যেসব প্রকল্প বাংলাদেশের স্বার্থে কার্যকর হবে, সেগুলো রাখা হবে—অন্যগুলো নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা হবে।
সব মিলিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও বিতর্কিত ইস্যু থাকলেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে বাস্তববাদী ও কৌশলগত ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে বিএনপি।
সবার দেশ/কেএম




























