রাজমিস্ত্রীর ঘর থেকে সংসদ—জনতার ক্যাপ্টেন হাসনাত
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘নির্বাচন’ শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে ছিলো ক্ষমতা, পেশিশক্তি, অর্থ আর বংশপরিচয়ের সমার্থক। কিন্তু কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের সদ্যসমাপ্ত সংসদ নির্বাচনের ফল সে পুরোনো ধারণায় বড় একটি প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। রাজমিস্ত্রীর ঘরে জন্ম নেয়া, কোনও রাজনৈতিক বংশীয় পরিচয় ছাড়া, অর্থ-বিত্তের প্রদর্শনীহীন এক তরুণ—হাসনাত আবদুল্লাহ—১ লাখ ৭২ হাজার ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন মাত্র ২৬ হাজার ভোট। এ ব্যবধান কেবল সংখ্যার নয়; এটি সময়ের মনোভাবেরও প্রতিফলন।
হাসনাত আবদুল্লাহর উত্থানকে আলাদা করে দেখার কারণ আছে। তিনি সে রাজনীতিক নন, যিনি ক্যাডার আর পোস্টার দিয়ে এলাকা দখল করেছেন। তিনি উঠে এসেছেন দরিদ্র রাজমিস্ত্রীর ঘর থেকে—যেখানে রাজনীতি মানে ছিলো না ক্ষমতার স্বপ্ন, বরং ছিলো টিকে থাকার সংগ্রাম। এ সংগ্রামই তাকে শিখিয়েছে সাহস, শিখিয়েছে নীরব সততা, আর শিখিয়েছে ক্ষমতার প্রতি মোহহীন থাকার কৌশল।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়াশোনা করা হাসনাত আবদুল্লাহ কেবল মেধাবী ছাত্রই ছিলেন না; তিনি ছিলেন প্রশ্ন করতে জানা এক তরুণ। জুলাই আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিলো স্পষ্ট ও ঝুঁকিপূর্ণ। যখন রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, গ্রেফতার, মামলা আর গুমের আশঙ্কা তরুণদের মুখ বন্ধ করে দিচ্ছিলো, তখন হাসনাত ছিলেন রাস্তায়, মাইক্রোফোনে, সোশ্যাল মিডিয়ায়—কখনও সামনে, কখনও আড়ালে। তিনি রাজনীতি করেছেন ক্যামেরার জন্য নয়, দায়বদ্ধতা থেকে।

এ নির্বাচনে তার জয় তাই হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিন জমে থাকা জনঅসন্তোষের একটি স্বচ্ছ রূপ। ভোটাররা কেবল একজন প্রার্থীকে বেছে নেননি; তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন পুরোনো রাজনীতির ভাষা, বংশীয় ও সম্পদের অহমিকার দেমাগ, চেহারা ও চুক্তিভিত্তিক প্রতিনিধিত্বকে। দেবিদ্বারের মানুষ দেখিয়ে দিয়েছেন—ক্ষমতা আর পেশিশক্তির বাইরে গিয়েও ভোট জেতা যায়, যদি প্রার্থী মানুষের গল্প জানে এবং নিজেই সে গল্পের অংশ হয়।
আরও পড়ুন <<>> নীরব সমর্থকদের দল বিএনপি, নেতাকর্মীদের নয়!
হাসনাতের প্রচারণা ছিলো ব্যতিক্রমী। ব্যানার, ফেস্টুন, গাড়িবহরের চেয়ে তার বড় শক্তি ছিলো মানুষের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলা। তিনি ভোট চেয়েছেন সহানুভূতির নামে নয়, বরং আস্থার ভিত্তিতে। ‘আমি আপনারই একজন’—এ বাক্যটি তার ক্ষেত্রে কোনও স্লোগান ছিলো না, ছিলো বাস্তবতা।

তার এ ভূমিধস জয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনও যুগের সূচনা করবে কি না—সে প্রশ্নের উত্তর এখনই দেয়া যাবে না। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, হাসনাত আবদুল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, রাজনীতি কেবল ক্ষমতার খেলা নয়; এটি নৈতিক অবস্থানও হতে পারে। তিনি দেখিয়েছেন, শিক্ষিত, সংগ্রামী, সৎ একজন তরুণও সংসদে যাওয়ার অধিকার রাখে—যদি জনগণ তাকে বিশ্বাস করে।
এ সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহ কেমন ভূমিকা রাখবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ তার কাঁধে কেবল দেবিদ্বারের নয়, পুরো তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা। যারা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো, যারা বিশ্বাস করতো ‘ভোটে কিছু হয় না’—তাদের বিস্মিত চোখ এখন এ তরুণের দিকে।

হাসনাতের জয় যদি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এটি একটি সুন্দর গল্প হয়েই থাকবে। কিন্তু যদি তিনি তার সাহস, সততা ও সংগ্রামের রাজনীতি সংসদেও ধরে রাখতে পারেন, তবে কুমিল্লা-৪-এর এ ফলাফল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বাঁকবদলের নাম হয়ে থাকবে।
লেখক ও সংবাদকর্মী




























