Sobar Desh | সবার দেশ পাবনা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১১:৫৪, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১২:০৩, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নভেম্বরে যোগ হবে রূপপুরের বিদ্যুৎ!

প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে আসবে ৩০০ মেগাওয়াট; শেষ মুহূর্তের পরীক্ষায় অনিশ্চয়তাও আছে

নভেম্বরে যোগ হবে রূপপুরের বিদ্যুৎ!
ছবি: সংগৃহীত

মাসের পর মাস পিছিয়ে অবশেষে উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী নভেম্বরেই কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করবে। একই সঙ্গে বিশ্বের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের নাম যুক্ত হবে।

তবে উৎপাদনে যাওয়ার আগে এখনও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারিগরি পরীক্ষা বাকি রয়েছে। বর্তমানে প্রেসারাইজার পাইলট অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি) সংক্রান্ত পরীক্ষা ও ত্রুটি নিরসনের কাজ চলছে। এ ধাপ সফলভাবে শেষ হওয়ার পরই রিঅ্যাক্টরে ফিশন রিঅ্যাকশন শুরু করে পাওয়ার স্টার্টআপের দিকে এগোবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, পিওআরভি-পরবর্তী ‘বি-টু’ ধাপ সম্পন্ন করতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ এবং টারবাইন দিয়ে ৩০ শতাংশ স্টিম তৈরি ও সংশ্লিষ্ট পরীক্ষায় আরও প্রায় ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ সবকিছু ‘আইডিয়াল প্রোগ্রাম’ অনুযায়ী চললে মোট সময় লাগবে প্রায় নয় সপ্তাহ বা দুই মাস।

এ হিসাবেই নভেম্বরকে সম্ভাব্য উৎপাদন শুরুর সময় হিসেবে ধরা হচ্ছে।

শেষ মুহূর্তের পরীক্ষাই বড় বাধা

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন গত ২৬ আগস্ট বলেন, আইডিয়াল প্রোগ্রাম অনুসরণ করা গেলে নভেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারে।

তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, শেষ মুহূর্তে কোনো পরীক্ষায় সমস্যা দেখা দিলে সময় আরও পিছিয়ে যেতে পারে।

বর্তমানে পিওআরভি পরীক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় মাস ধরে এই পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া যায়নি। পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে সফল হলে এতদিনে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারত।

তবে পিওআরভি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও ফিশন রিঅ্যাকশন ও পাওয়ার স্টার্টআপের বিভিন্ন ধাপে নতুন কোনও কারিগরি সমস্যা দেখা দেবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

যেভাবে তৈরি হবে বিদ্যুৎ

রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হবে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বি-ওয়ান ধাপে রিঅ্যাক্টরে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়। এরপর শুরু হয় বি-টু বা ফিজিক্যাল স্টার্টআপ পর্যায়।

সহজ ভাষায়, এ ধাপে রিঅ্যাক্টরে জ্বালানি লোড করা এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পরীক্ষা শেষ করার পর নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিশন রিঅ্যাকশন শুরু করা হবে।

ফিশন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে বিপুল তাপশক্তি উৎপন্ন হবে। সে তাপ দিয়ে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হবে। বাষ্পের চাপ ব্যবহার করে টারবাইন ঘোরানো হবে। আর টারবাইনের সঙ্গে সংযুক্ত জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎ।

প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে এবং পরবর্তী ধাপে কেন্দ্রের সক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে।

ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ ১০ টাকার নিচে?

রূপপুর প্রকল্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ২০১৬ সালে ৪ টাকা ৬৫ পয়সা ধরা হয়েছিলো। তবে প্রকল্পের বর্তমান বাস্তবতায় বিদ্যুতের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়, অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিমা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খরচও বিবেচনায় আসবে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও রূপপুর প্রকল্প কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। পিডিবির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে সমাধান হওয়ার পর বিদ্যুতের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করা হবে।

প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেনের ধারণা, সব খরচ যুক্ত হলেও রূপপুরের বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি মূল্য দুই অঙ্কে যাবে না; অর্থাৎ ১০ টাকার নিচে থাকতে পারে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন স্পেন্ট ফুয়েল

রূপপুরের উৎপাদন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, পারমাণবিক জ্বালানি ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

রিঅ্যাক্টরে ব্যবহারের পর যে পারমাণবিক জ্বালানি অবশিষ্ট থাকে, তাকে স্পেন্ট ফুয়েল বলা হয়। বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী ব্যবহৃত জ্বালানি রাশিয়ায় ফিরিয়ে নেয়ার কথা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক চুক্তি এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যবহৃত জ্বালানি তাৎক্ষণিকভাবে রাশিয়ায় পাঠানোর প্রয়োজন নেই। এটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রিঅ্যাক্টরের নির্ধারিত ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা সম্ভব।

ভারি বর্জ্য নিয়ে উদ্বেগ

তবে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ শুধু স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নিয়মিত উৎপাদনে যাওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের তেজস্ক্রিয় ও ভারি বর্জ্য তৈরি হবে। এসব বর্জ্য দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, স্পেন্ট ফুয়েলের তুলনায় এ মুহূর্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার পর প্রতিদিন তৈরি হতে থাকা ভারি বর্জ্য।

তার মতে, এসব বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য এখন পর্যন্ত কোনও সংরক্ষণাগার তৈরি হয়নি। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কর্তৃপক্ষকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।

বিদ্যুৎ আসার আনন্দের সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও জরুরি

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক প্রকল্প। জাতীয় গ্রিডে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়া দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাফল্য শুধু উৎপাদন শুরু করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং নিরাপদ উৎপাদন, নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনা, ব্যবহৃত জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই প্রকল্পটির প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।

নভেম্বরে উৎপাদন শুরু করা গেলে তা হবে বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। কিন্তু উৎপাদনে যাওয়ার তাড়াহুড়োয় নিরাপত্তা পরীক্ষার কোনও ধাপ যেনো আপসের শিকার না হয়—এ বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

বিশেষ করে পিওআরভি পরীক্ষায় বিলম্বের বিষয়টি দেখিয়ে দেয়, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিটি কারিগরি ধাপ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কয়েক সপ্তাহের বিলম্ব অর্থনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হতে পারে, কিন্তু নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সময় নেয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি মূল্য ১০ টাকার নিচে রাখা গেলে তা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়—ঋণের সুদ, অপারেশন, রক্ষণাবেক্ষণ, বিমা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও দীর্ঘমেয়াদে বিবেচনায় নিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত তেজস্ক্রিয় বর্জ্য এমন একটি বিষয়, যার দায় বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও বহন করতে হয়। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি শুরু থেকেই বর্জ্য সংরক্ষণ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি।

রূপপুরের বিদ্যুৎ তাই শুধু একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন নয়; এটি বাংলাদেশের পারমাণবিক যুগে প্রবেশ। আর সে যুগের প্রথম শর্ত—বিদ্যুতের পাশাপাশি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সবার দেশ/এমকেজে

শীর্ষ সংবাদ:

মেসির বিদায়ে আবেগঘন আন্তোনেলা
লঘুচাপের প্রভাবে ঝড়ো হাওয়ার আশঙ্কা, ৩ নম্বর সতর্কসংকেত
কানাডার পার্লামেন্টের এমপি বাংলাদেশি তানভীর
ভারতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত ১১; রেল চলাচল বন্ধ
নভেম্বরে যোগ হবে রূপপুরের বিদ্যুৎ!
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধে মার্কিন সেনাপ্রধানের পদত্যাগ
ফিল্মি কায়দায় নববধূ ‘ছিনতাই’! যা বললেন কনে তামান্না
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, সামনে ১০ চ্যালেঞ্জ
ঢাবির মেয়েদের হল বন্ধ রাত ১১টায়
নবম পে-স্কেল অনুমোদন: কার বেতন কত
নেপালে বন্যায় প্রাণহানি বেড়ে ৯১৯, নিখোঁজ ৪ হাজারের বেশি
জামালপুরে বাস-ইজিবাইক সংঘর্ষে নিহত ৪
ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য সুখবর
শিল্প কোনও পাপ নয়: প্রভা
মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্সের আনুষ্ঠানিক যাত্রা
দেশে প্রথম রোবটিক সার্জারি, প্রথম দিনে ২ রোগীর অস্ত্রোপচার
আন্তর্জাতিক ফুটবলকে গুডবাই বললেন মেসি
পূজার আগেই পাকিস্তানের হামলার প্রস্তুতিতে শঙ্কিত ভারত