সাকার হ্যাটট্রিকে রঙিন সমাপ্তি
১০ গোলের রোমাঞ্চকর থ্রিলার, ফ্রান্সকে হারিয়ে তৃতীয় ইংল্যান্ড
বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেলেও টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচটি দারুণভাবে স্মরণীয় করে রাখল ইংল্যান্ড। মায়ামিতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে গোলবন্যার এক রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ফ্রান্সকে ৬-৪ গোলে পরাজিত করে বিশ্বকাপ শেষ করেছে থ্রি লায়ন্সরা। বুকায়ো সাকার দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক, ডেকলান রাইসের অনবদ্য পারফরম্যান্স এবং শেষ মুহূর্তে জুড বেলিংহ্যামের অসাধারণ গোল ইংল্যান্ডকে এনে দেয় দাপুটে জয়।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে থমাস টুখেলের শিষ্যরা। মাত্র তৃতীয় মিনিটেই মাঝমাঠে ফ্রান্সের ডেজিরে দুয়ের ভুল পাস থেকে বল কেড়ে নিয়ে একাই এগিয়ে যান ডেকলান রাইস। বক্সের বাইরে থেকে নেয়া তার নিখুঁত বাঁকানো শট ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মেনিয়াঁকে পরাস্ত করে জালে জড়িয়ে যায়। দ্রুত পাওয়া এ গোল ইংল্যান্ডকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
১৯তম মিনিটে ব্যবধান আরও বাড়ায় ইংল্যান্ড। ডেকলান রাইসের নিখুঁত ফ্রি-কিক থেকে বক্সে উঠে আসা এজরি কনসা শক্তিশালী হেডে বল জালে পাঠিয়ে দলকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। ফরাসি রক্ষণভাগের সমন্বয়হীনতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে সহজেই গোল আদায় করে নেয় ইংল্যান্ড।
প্রথমার্ধের শেষভাগে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেয় থ্রি লায়ন্সরা। ৩৭তম মিনিটে মার্কাস রাশফোর্ডের চমৎকার পাস ধরে গোলরক্ষককে কাটিয়ে বল জালে পাঠান বুকায়ো সাকা। এরপর যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে আবারও রাশফোর্ডের আক্রমণ তৈরি থেকে দ্বিতীয় গোল করেন সাকা। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই ৪-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড, আর তখনই ম্যাচের ভাগ্য প্রায় নির্ধারিত হয়ে গেছে বলেই মনে হচ্ছিলো।
তবে বিরতির পর সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে মাঠে নামে ফ্রান্স। ৪৮তম মিনিটে মাইকেল অলিসের পাস থেকে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে গোল করে ব্যবধান কমান অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। এ গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের নবম গোলের দেখা পান তিনি এবং লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ গোলসংখ্যার রেকর্ডেও ভাগ বসান।
এর মাত্র ছয় মিনিট পর ইংল্যান্ডের একটি আক্রমণ ভেস্তে দিয়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠে গোল করেন ব্র্যাডলি বারকোলা। ৪-২ ব্যবধানে ফিরে এসে নতুন করে আশার আলো দেখে ফ্রান্স।
ম্যাচের ৬৭তম মিনিটে আবারও আঘাত হানেন এমবাপ্পে। অলিসের আরেকটি দারুণ পাস থেকে শক্তিশালী শটে নিজের দ্বিতীয় গোল করে ব্যবধান কমিয়ে আনেন ৪-৩-এ। তখন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ যেন ধীরে ধীরে ফরাসিদের দিকেই ঝুঁকতে শুরু করে এবং অসম্ভব এক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
কিন্তু সে সম্ভাবনায় পানি ঢেলে দেন বুকায়ো সাকা। ৮৬তম মিনিটে পাওয়া পেনাল্টি থেকে ঠাণ্ডা মাথায় গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন এ ইংলিশ উইঙ্গার। তার গোলেই ইংল্যান্ড আবার দুই গোলের ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
তবুও নাটক শেষ হয়নি। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে দায়ো উপামেকানোর পাস থেকে ডান প্রান্ত দিয়ে বক্সে ঢুকে জোরালো শটে গোল করেন ওসমান দেম্বেলে। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৫-৪, আর শেষ কয়েক মিনিটে ম্যাচে ফিরে আসার শেষ চেষ্টা চালায় ফ্রান্স।
তবে শেষ হাসিটা ছিলো ইংল্যান্ডেরই। যোগ করা সময়ের অষ্টম মিনিটে বদলি হিসেবে নামা জুড বেলিংহ্যাম মাঝমাঠ থেকে একক নৈপুণ্যে কয়েকজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে অসাধারণ এক গোল করেন। রিয়াল মাদ্রিদের এ মিডফিল্ডারের দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে ৬-৪ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয় ইংল্যান্ডের।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন ইংলিশ ফুটবলাররা। যদিও এটি ছিলো তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ, তবু এমন রোমাঞ্চকর ১০ গোলের লড়াই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অন্যদিকে হারলেও ফ্রান্সের খেলোয়াড়রা লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দিয়ে মাঠ ছাড়েন। ম্যাচ শেষে দুই কোচ থমাস টুখেল ও দিদিয়ের দেশম একে অপরকে আলিঙ্গন করে ক্রীড়াসুলভ মনোভাবের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
ফাইনালের মঞ্চে জায়গা না পেলেও বিশ্বকাপের শেষ দিনে আক্রমণাত্মক ফুটবল, নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা এবং একের পর এক দৃষ্টিনন্দন গোলে দর্শকদের পূর্ণ বিনোদন উপহার দিয়েছে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। ১০ গোলের এ মহারণ দীর্ঘদিন ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে জায়গা করে নেবে।
সবার দেশ/কেএম




























