Sobar Desh | সবার দেশ

প্রকাশিত: ১৫:২৩, ২৬ অক্টোবর ২০২৫

নিখোঁজ সাবেক স্পিকারের খোঁজে সরকার

কোথায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন শিরীন শারমিন চৌধুরী!

যে নারী শেখ হাসিনার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ছিলেন, সে নারীই আজ নিখোঁজ। হাসিনার পতনের দিন তিনি বুঝেছিলেন, সব ক্ষমতার ভিত্তি বালুর মতো ভেঙে পড়েছে।

কোথায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন শিরীন শারমিন চৌধুরী!
ছবি: সংগৃহীত

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যখন ফ্যাসস্ট হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে হেলিকপ্টারযোগে ভারতে পালিয়ে যান, তখন হতবাক হয়ে পড়েছিলেন তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের একচ্ছত্র শাসনের পতনের এমন পরিণতি তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি।

সংসদ সচিবালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন এমন এক সাবেক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানান, শেখ হাসিনা দেশত্যাগের কয়েক ঘণ্টা আগেও শিরীন শারমিন সংসদ ভবনের পশ্চিম পাশের সরকারি বাসভবনে ছিলেন। চারদিক থেকে আন্দোলনের খবর পৌঁছালেও তিনি ছিলেন নির্বিকার, যেনো তখনও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না—যে নেত্রীর ছায়ায় তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উত্থান, সে শেখ হাসিনাই ক্ষমতা হারিয়ে পালাতে পারেন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, 

৫ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত তিনি স্বাভাবিকভাবে দাফতরিক ফাইলে সই করছিলেন। এমনকি কিছু অফিসিয়াল নোটও পাঠান। পরে খবর আসে, হাজার হাজার ছাত্র-জনতা সংসদ ও গণভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তখন হঠাৎ করেই তিনি গানম্যান ও প্রটোকল অফিসারদের রেখে নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে চেপে সংসদ এলাকা ত্যাগ করেন। গাড়িতে ছিলেন তার স্বামী সৈয়দ ইশতিয়াক হোসেন ও ছোট ছেলে।

এর পর থেকে সাবেক স্পিকারের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ বলছেন, তিনি গোপনে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে গেছেন; আবার কেউ দাবি করছেন, তিনি ঢাকাতেই আত্মগোপনে আছেন।

সরকারের বিভিন্ন দফতর, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে তার বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়া হবে, তা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। একাধিক সূত্র জানায়, তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হত্যা মামলার তদন্তও এক বছরেও শেষ হয়নি—ফলে অন্তর্বর্তী সরকার সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, 

সাবেক স্পিকার কোথায় আছেন, এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনও অফিসিয়াল তথ্য নেই। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানা গেছে, তিনি ঢাকাতেই ভাইয়ের বাসায় স্বামীসহ বসবাস করছেন। আবার অন্য একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, তিনি হয়তো পাসপোর্ট ছাড়াই স্থলপথে সীমান্ত অতিক্রম করেছেন।

মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখার এক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছে। ওপরের নির্দেশনা ছাড়া কোনও পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। আদালত থেকে পরোয়ানা বা নির্দেশ এলে অবশ্যই আমরা তা বাস্তবায়ন করবো।

তবে এক গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেন, শিরীন শারমিন এখনও ঢাকায় আছেন। রাজধানীর এক নিরাপদ এলাকায় ভাইয়ের বাসায় অবস্থান করছেন তিনি। তার সঙ্গে স্বামী ও ছোট ছেলে রয়েছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনও গ্রেপ্তারি নির্দেশ বা নজরদারির আদেশ দেয়া হয়নি।

গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, ২০২৫ সালের শুরুতে খিলক্ষেতে তার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। সে সময় একবার তাকে গ্রেফতারের পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছিলো, কিন্তু শেষ মুহূর্তে অজানা কারণে সে অভিযান বাতিল করা হয়। এরপর থেকে তিনি একাধিকবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন। প্রায় ছয় মাস আগে তিনি রাজধানীর এক সুরক্ষিত আবাসিক এলাকায় ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে থাকেন।

আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—

আত্মগোপনে থাকাকালীনই তিনি নতুন ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। পাসপোর্ট অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা তাকে সহযোগিতা করেছেন বলেও নিশ্চিত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন শাখা। আবেদনকালে তিনি আঙুলের ছাপ ও আইরিস স্ক্যান দেন এবং ধানমন্ডির একটি ঠিকানা উল্লেখ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে যাচাইয়ে দেখা গেছে, তিনি ওই ঠিকানায় থাকছেন না।

এক সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, এটি স্পষ্ট যে তিনি পাসপোর্ট ও পরিচয়পত্র পুনর্নবীকরণের মাধ্যমে নতুনভাবে আত্মগোপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সরকারের কাছে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

তবে তার ভারত পাড়ি দেয়ার বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়। একাধিক সূত্রের দাবি, শেখ হাসিনা পালানোর কিছুদিন পরই শিরীন শারমিনও গোপনে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের কোনো স্থানে আশ্রয় নেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, তিনি ঢাকাতেই আছেন এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

প্রসঙ্গত, শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ এই স্পিকার ছিলেন আওয়ামী লীগের ‘পুতুল সংসদ’-এর প্রতীকী মুখ। তার সময়েই সংসদে এককভাবে আওয়ামী লীগের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিরোধীদলীয় আসন প্রায় শূন্য থাকে। সমালোচকরা বলেন, তার সভাপতিত্বে সংসদ ছিল ‘একদলীয় গণতন্ত্রের মঞ্চ’, যেখানে বিরোধী কণ্ঠরোধ করা ছিলো নিয়মিত ঘটনা।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা ও আন্দোলনকারীদের ওপর হত্যাযজ্ঞে সহযোগিতার অভিযোগে মামলা হয়। কিন্তু আন্দোলনের পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতায় সে তদন্ত এখনো ঝুলে আছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এ নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। একজন মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা বলেন, 

আইন মন্ত্রণালয় বলছে, তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত গ্রেফতার সম্ভব নয়। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করছে, তিনি পলাতক অবস্থায় রয়েছেন, ফলে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফরোয়ার্ড নোটিস’-এ তালিকাভুক্ত করা উচিত।

এদিকে, সাবেক স্পিকার হিসেবে শিরীন শারমিন চৌধুরীর সংসদ ভবনের বাড়ি ও যানবাহনের বরাদ্দও ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। তার বেশ কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্থগিত রয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত সরকার তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক রেড অ্যালার্ট বা ওয়ারেন্ট জারি করেনি।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক বৈঠকে তার বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখানে কয়েকজন উপদেষ্টা বলেন, হাসিনা সরকারের সময় সংসদ ছিলো দমননীতির হাতিয়ার, আর তার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন স্পিকার নিজে। তার বিরুদ্ধে মামলা ঝুলিয়ে রাখলে আইনের শাসনের বার্তা দেয়া যাবে না।

কিন্তু এখনও পর্যন্ত শিরীন শারমিন চৌধুরীর অবস্থান নিশ্চিত নয়। কেউ বলছেন তিনি ভারতেই, কেউ বলছেন ঢাকায় আত্মগোপনে। সরকারও স্পষ্ট করে কিছু জানাতে পারছে না।

একজন প্রবীণ সংসদ কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, যে নারী শেখ হাসিনার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ছিলেন, সে নারীই আজ নিখোঁজ। হাসিনার পতনের দিন তিনি বুঝেছিলেন, সব ক্ষমতার ভিত্তি বালুর মতো ভেঙে পড়েছে।

সবার দেশ/কেএম

শীর্ষ সংবাদ:

ইবি’র স্বতন্ত্র ‘ডি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন
মুখ লুকানোর পথও বন্ধ হলো ট্রাম্পের
প্রতারণা দিয়ে শুরু বিএনপির পথচলা: জামায়াত আমির
সশস্ত্র বাহিনী রাষ্ট্রের, কোনও ব্যক্তি বা দলের নয়: প্রধানমন্ত্রী
ইরান যুদ্ধের প্রতিবাদে উত্তাল ইসরায়েল
হত্যাচেষ্টা মামলায় জামিন পেলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী
কিংবদন্তি গায়িকা আশা ভোঁসলে আর নেই
যুদ্ধে হেরে আলোচনার টেবিলে আবদার যুক্তরাষ্ট্রের—অভিযোগ ইরানের
‘ইসলামাবাদ টকস’ ব্যর্থ হওয়ার দায় যুক্তরাষ্ট্রের: ইরান
‘মব কালচার’ ঠেকাতে সরকার ব্যর্থ: এনসিপি
ইরান-যুক্তরাষ্ট আলোচনা ব্যর্থ, ফিরে যাচ্ছেন ভ্যান্স
শিরোপার পথ মজবুত করলো বার্সেলোনা
কুকুর-কুমির কাণ্ডে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: প্রতিমন্ত্রী
সাত বড় ইস্যুতে নির্ধারিত হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ
তেল আছে শুধু সংসদে, দেশে নেই: জামায়াত আমির
বেনাপোল কাস্টমসে ৪ সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স স্থগিত