নো ম্যান্স ল্যান্ডে মানবিক সংকট
ভারতের নতুন ‘পুশইন’ চেষ্টা: ৪ সীমান্তে আটকা ৮৮ জন
ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ আবারও বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ অন্তত ৮৮ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) চেষ্টা করেছে। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কঠোর অবস্থান নেয়ায় তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে এসব মানুষ বর্তমানে শূন্যরেখা ও নো ম্যান্স ল্যান্ডে মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও নওগাঁ সীমান্ত দিয়ে মোট ৬০ জনকে এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্ত দিয়ে আরও ২৮ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চালায় বিএসএফ। তবে বিজিবির বাধার মুখে তাদের বাংলাদেশে ঢোকানো সম্ভব হয়নি।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে একাধিক পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত কোনও সমাধান হয়নি। ফলে সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে মানবিক উদ্বেগ বাড়ছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অন্তত ১০টি পৃথক পুশ ইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৯০ জনকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা হয়।
লালমনিরহাটের আদিতমারী, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম সীমান্তে মোট ৩৩ জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা চালানো হয়। এর মধ্যে আদিতমারী সীমান্তে ১২ জন, হাতীবান্ধায় ১১ জন এবং পাটগ্রামে ১০ জনকে সীমান্ত অতিক্রম করানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবি ও স্থানীয়দের সতর্কতায় এসব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়ন জানায়, সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত টহল জোরদার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যরা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্ত দিয়ে পাঁচ পুরুষ, দুই নারী ও তিন শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবির বাধার মুখে তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। দুই দেশের কেউই তাদের নিজ নিজ ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমতি না দেয়ায় খোলা আকাশের নিচে ফসলি জমিতে বসে থাকতে দেখা গেছে তাদের।
নওগাঁর সাপাহার উপজেলার হাপানিয়া সীমান্তে আরও ১৭ জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা চালায় বিএসএফ। খবর পেয়ে বিজিবি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে দেয়। বর্তমানে তারাও সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে। সেখানে বিএসএফের ঠেলে পাঠানো ২৮ জন গত কয়েকদিন ধরে নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী ও ছয়জন শিশু রয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ জনের মধ্যে অন্তত ১৩ জনের বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলায়। তারা কয়েক বছর আগে ভারতে গিয়েছিলেন। ইতোমধ্যে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যও সীমান্তে পৌঁছানো হয়েছে। তবে এখনও তাদের বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে ভারী বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করতে হয়েছে এসব মানুষকে। পর্যাপ্ত খাবার ও চিকিৎসা সুবিধার অভাবে তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। তাদের মধ্যে একজন বৃদ্ধা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলেও জানা গেছে।
বিজিবি ১৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বিএসএফ ২৮ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর বিষয়টি পতাকা বৈঠকে স্বীকার করেছে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কোনও কার্যকর সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
অন্যদিকে, পঞ্চগড়ের ৫৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। এ বিষয়ে বিজিবি নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।
ঘটনার পর বিজিবির রাজশাহী সেক্টর কমান্ডার কর্নেল কামাল হোসেন সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, সীমান্তে পুশ ইন প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
সীমান্তজুড়ে চলমান এ পরিস্থিতি নতুন করে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশ ইন ইস্যুকে আলোচনায় এনেছে। একই সঙ্গে শূন্যরেখায় আটকে থাকা নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের মানবিক পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
সবার দেশ/কেএম




























