মিরপুরে নির্বাচনি জনসভায় জামায়াত আমির
স্বপ্নের দেশ গড়তে ১০ দলের প্রার্থী ও ‘হ্যাঁ’-কে বিজয়ী করার আহ্বান
স্বপ্নের, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে হবে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিশ্চিত করতে হবে—এমন আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এই বিজয় কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর নয়; এটি হবে সাধারণ মানুষের বিজয়।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর আদর্শ স্কুল মাঠে নিজ নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। এ জনসভার মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি প্রচার কার্যক্রম শুরু করেন। বিকেল তিনটায় জনসভা শুরু হলেও দুপুরের পর থেকেই বিভিন্ন স্থান থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে মাঠে জড়ো হতে থাকেন জামায়াত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। একপর্যায়ে মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশের সড়কেও ছড়িয়ে পড়ে জনসমাগম। পুরো এলাকা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ব্যানার ও ফেস্টুনে ছেয়ে যায়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা শিশু, তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষের জন্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেই দেশ নিয়ে সবাই গর্ব করে বলবে—আমি বাংলাদেশি। নারী-পুরুষ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বৈষম্য, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ে তোলা হবে।
তিনি বলেন, জামায়াত ঘোষণা দিয়েছে—আমরা চাঁদা নেবো না, কাউকে চাঁদাবাজি করতে দেবো না। আমরা দুর্নীতি করবো না, কাউকে দুর্নীতি করতে দেবো না। ইনসাফ আর টাকার বিনিময়ে বিক্রি হবে না। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবীদের যে স্বপ্ন, সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতেই ১০ দলের প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।
জনসভায় বিএনপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন কার্ড বিতরণের ঘোষণার দিকে ইঙ্গিত করে জামায়াত আমির বলেন, আমরা কোনও কার্ডের ওয়াদা করছি না। দুই হাজার টাকার কার্ডে কোনও পরিবারের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে।
তিনি বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় দেশ চলে। কিন্তু এর বাইরে আরেকটি বেসরকারি ট্যাক্স চলছে, যা গরিব, ভিক্ষুক থেকে শুরু করে সবার কাছ থেকেই আদায় করা হয়। এ ট্যাক্সের নামে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। এটি আর চলতে দেয়া হবে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সমাজে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও বৈষম্যের মূল কারণ ইনসাফের অভাব। ইনসাফ থাকলে দুর্নীতিবাজ, লুটেরা কিংবা ব্যাংক ডাকাতরা নিরাপদে পালিয়ে যেতে পারতো না, বিদেশে বেগমপাড়া বানাতে পারতো না।
তিনি বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছরে দেশকে রক্তাক্ত করা হয়েছে। ইতিহাসের কলঙ্ক হিসেবে আয়নাঘর তৈরি করা হয়েছে। সেখান থেকে সেনা কর্মকর্তা থেকে শুরু করে উচ্চ আদালতের আইনজীবীরাও রক্ষা পাননি। অনেক মানুষ আজও নিখোঁজ, যাদের স্বজনেরা ফেরত পাননি।
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, বাংলাদেশ সবার জন্মভূমি। এখানে আর কোনও ফ্যাসিবাদের ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ নতুন রূপে ফিরে এলেও তার পরিণতি একই হবে।
তিনি বলেন, বিগত তিন নির্বাচনে মানুষ ভোট দেয়ার সুযোগ পায়নি। ভোট ডাকাতি হয়েছে। নতুন করে কোনও ভোট ডাকাতি দেখতে চাই না। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, চব্বিশের তরুণদের বিপ্লবের কারণেই আজ আমরা কথা বলতে পারছি। তাদের লড়াই এখনও শেষ হয়নি। ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত এ সংগ্রাম চলবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যারা নিজেদের কর্মীদের দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও হত্যার রাজনীতি থেকে রক্ষা করতে পারে না, তারা আগামীর বাংলাদেশও রক্ষা করতে পারবে না। যত স্বপ্নই দেখাক না কেনো, তাদের ক্ষমতায় আসার সুযোগ দেয়া যাবে না।
তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি মানুষ দুটি ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে প্রস্তুত। একটি গণভোটে ‘হ্যাঁ’, আরেকটি নির্বাচনে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ের মাধ্যমে দখলবাজ, চাঁদাবাজ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ‘হ্যাঁ’।
এ সময় তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলামের হাতে প্রতীকী শাপলা কলি তুলে দেন। পাশাপাশি ঢাকা-১২, ১৪, ১৬ ও ১৭ আসনে জামায়াত প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দিয়ে তাদের বিজয়ী করার আহ্বান জানান।
নিজ নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১৫ আসনের প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, তিনি ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়ে সমস্যার সমাধান করবেন। যেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়, সেগুলোর কারণ জনগণের কাছে স্পষ্ট করবেন। তিনি বলেন, বিজয়ী হলে এ এলাকায় মানসম্মত হাসপাতাল, বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করবেন এবং মনিপুর স্কুলকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে উদ্যোগ নেবেন।
তিনি বলেন, আমি এখানে জামায়াতের আমির হিসেবে নয়, বরং সব বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড়িয়েছি। সবার ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবো।
চব্বিশের আন্দোলনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যাদের কারণে সেই বিপ্লব হয়েছে, তাদের ওপর এখনও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। শহীদ শরিফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ড তার প্রমাণ। তিনি বলেন, ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ে এখন হাদী। তার স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই থামবে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তরুণদের এমন শিক্ষা দিতে চান, যা শুধু সার্টিফিকেট নয়, বরং দক্ষতা তৈরি করে চাকরি নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, নিরাপদ কর্মস্থল ও নিরাপদ রাস্তাঘাট গড়ে তুলতে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হবে।
জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম বলেন, ঢাকা-১৫ আসনের মানুষ ভাগ্যবান যে জামায়াতের আমির এখান থেকে নির্বাচন করছেন। তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের একজন কাণ্ডারি। তার পক্ষে সারা দেশে যে জনজোয়ার তৈরি হয়েছে, তা ১২ ফেব্রুয়ারি স্পষ্টভাবে দেখা যাবে।
নির্বাচন কমিশন ও সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, নির্বাচন অবশ্যই সুষ্ঠু হতে হবে। কোনও ধরনের বৈষম্য মানা হবে না। অন্য কোনও পরিকল্পনা কাজে দেবে না। আমাদের মাঠে নামতে বাধ্য করবেন না।
বিএনপির কার্ড বিতরণের ঘোষণা প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, কার্ড দেয়া হলেও তা জনগণের কাছে পৌঁছাবে তো? ঘুষ ছাড়া পাওয়া যাবে না তো? একদিকে কার্ডের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণখেলাপিদের প্রার্থী করা হচ্ছে। নতুন কোনও লুটেরাকে ক্ষমতায় যেতে দেয়া হবে না।
জনসভায় শিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, সারা দেশে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি একটি নতুন ভোরের সূচনা হবে।
ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের নির্বাচন পরিচালক আব্দুর রহমান মুসার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন, মোবারক হোসাইন, জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত আন্দোলনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও জুলাই আন্দোলনের প্রতিনিধিরা।
সূত্র জানায়, ঢাকার এই জনসভার মধ্য দিয়ে জামায়াত আমিরের টানা চার দিনের নির্বাচনি কর্মসূচি শুরু হয়েছে। শুক্রবার থেকে তিনি উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় সফর করবেন। আগামী ২৫ জানুয়ারি তিনি ফের ঢাকায় বিভিন্ন আসনে গণসংযোগে অংশ নেবেন।
সবার দেশ/কেএম




























