আল-জাজিরার বিশ্লেষণ
আসন্ন নির্বাচনে ইতিহাস বদলে দেয়ার সুযোগ জামায়াতের
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব মোড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশটির বৃহত্তম ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামী প্রথমবারের মতো কোনো নির্বাচনী জোটের প্রধান শক্তি হিসেবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে আছে—এমন মূল্যায়ন করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াত এখন তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সুযোগের মুখোমুখি। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। সে সঙ্গে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগকে অন্তর্বর্তী সরকার নিষিদ্ধ করায় এবারের নির্বাচন কার্যত নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে মূল লড়াইটি দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রন্টরানার হিসেবে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিপরীতে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আরও কয়েকটি ইসলামি দলের সমন্বয়ে গঠিত একটি নতুন জোট।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো জামায়াতের উত্থানকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। গত ডিসেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) জরিপে দেখা যায়, বিএনপির জনসমর্থন ৩৩ শতাংশ, আর জামায়াত পেয়েছে ২৯ শতাংশ সমর্থন। অর্থাৎ বিএনপির ঠিক পেছনেই অবস্থান করছে দলটি।
এরপর গত সপ্তাহে প্রকাশিত বাংলাদেশের কয়েকটি সংস্থার যৌথ জরিপে ব্যবধান আরও কমে আসে। সেখানে বিএনপির সমর্থন ধরা হয় ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ, আর জামায়াতের সমর্থন ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান জামায়াত নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত যদি এ নির্বাচনে জয়ী হয়, তবে সেটি হবে দলটির জন্য এক নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। কারণ বিগত দেড় দশক ধরে দলটি ছিল রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের কেন্দ্রে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাদের শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ ফাঁসির দণ্ড পেয়েছেন, কেউ বা দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ভোগ করছেন। দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রমও ছিলো কার্যত নিষিদ্ধ অবস্থায়।
১৯৪১ সালে উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ সৈয়দ আবুল আলা মওদুদীর প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলো। এ ইতিহাস আজও দেশের একটি বড় অংশের মানুষের মনে ক্ষোভ ও বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্ব দাবি করছে, গত ১৫ বছরের নিপীড়ন ও রাজনৈতিক বঞ্চনা তাদের প্রতি জনগণের সহানুভূতি তৈরি করেছে।
জামায়াতের নায়েবে আমির ড. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আল-জাজিরাকে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ৫৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসন দেখেছে এবং এখন তারা একটি ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। তিনি দাবি করেন, জামায়াত নিজেকে একটি মধ্যপন্থী ইসলামি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে।
এবারের নির্বাচনে দলটির কৌশলেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। প্রথমবারের মতো জামায়াত খুলনায় কৃষ্ণ নন্দী নামে একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থা অর্জনের একটি প্রতীকী ও কৌশলগত পদক্ষেপ। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে শতাধিক সনাতন ধর্মাবলম্বীর জামায়াতে যোগ দেয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
তবে জামায়াতের সম্ভাব্য ক্ষমতায় যাওয়া নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগও কম নয়। অনেকের আশঙ্কা, একটি ইসলামি দল রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে শরিয়া আইন কার্যকরের উদ্যোগ নিতে পারে কিংবা নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার সংকুচিত হতে পারে। যদিও জামায়াত নেতারা বারবার বলছেন, তারা বিদ্যমান ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই সংস্কারমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবেন।
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র কনসালটেন্ট থমাস কিন আল-জাজিরাকে বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে ভারতের বিজেপি সরকারের সঙ্গে জামায়াতের আদর্শিক পার্থক্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা জামায়াতের জন্য ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সাংগঠনিক দিক থেকেও জামায়াত বর্তমানে বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। দলটির ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে, যা মাঠপর্যায়ে তাদের প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
জামায়াত নেতাদের দাবি অনুযায়ী, দলটির সমর্থকের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি এবং নিবন্ধিত রুকন বা সদস্য রয়েছে প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার। বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং এটি জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের একটি কঠিন পরীক্ষা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটই নির্ধারণ করবে—দীর্ঘদিন বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এ দলটি তাদের সাংগঠনিক শক্তিকে রাষ্ট্রীয় বৈধতায় রূপ দিতে পারবে কি না।
সূত্র: আল জাজিরা।
সবার দেশ/কেএম




























