‘আমি সন্তানদের বাবাকে কী সান্ত্বনা দেব’
গোসলে নেমে প্রাণ গেলো পাঁচ বোনের
‘হুমাইরা এখন আমার একমাত্র সন্তান। পেটের দায়ে তার বাবা বিদেশে। আমি সন্তানদের বাবাকে কী সান্ত্বনা দেবো? আমার বড় দুই সন্তান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেল।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন খাতিজা। কোলে তখন তার একমাত্র জীবিত সন্তান হুমাইরা। শুক্রবার দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দেবিনগর ইউনিয়নের চর চাকলা গ্রামে পদ্মার একটি শাখা নদীতে গোসল করতে নেমে প্রাণ হারিয়েছে পাঁচ মেয়েশিশু। নিহতরা পরস্পরের মামাতো, ফুপাতো ও চাচাতো বোন।
নিহত পাঁচ শিশু হলো চর চাকলা গ্রামের মাসুদ রানার মেয়ে সুমাইয়া (৯) ও আবিদা (৭), একই গ্রামের নেজাম উদ্দিনের মেয়ে সুমাইয়া (১২) ও সুরাইয়া (৯) এবং শরীফুল ইসলামের মেয়ে শরীফা (৮)।
নিহত সুমাইয়া ও সুরাইয়া খাতিজার দুই মেয়ে। তাদের বাবা নিজামুল হক রাজমিস্ত্রির কাজের জন্য বিদেশে রয়েছেন। দুই মেয়ের মৃত্যুর খবর পেলেও জানাজায় অংশ নিতে পারেননি তিনি।
এ অবস্থায় নিজামের বাবা ওমর আলী পান্নাও শোকে ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন,
আমার ছেলের দুই সন্তান মারা গেলো। এখন আমি ছেলেকে কী উত্তর দেবো, কীভাবে তাকে সান্ত্বনা দেবো—আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার জুমার নামাজের সময় গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মসজিদে ছিলেন। এ সুযোগে শিশুরা কাউকে না জানিয়ে স্থানীয়ভাবে ‘মরা নদী’ নামে পরিচিত পদ্মার শাখা নদীতে গোসল করতে নামে। কখন তারা পানিতে নেমেছিলো, তা পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেননি।
পরে খবর ছড়িয়ে পড়ে, কয়েকজন শিশু পানিতে ডুবে গেছে। স্থানীয় লোকজন দ্রুত নদীতে নেমে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। একপর্যায়ে পাঁচ শিশুকেই পানি থেকে উদ্ধার করা হয়। তবে ততক্ষণে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনার পর চর চাকলা গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার পরিবেশ।
নিহত শিশুদের আত্মীয় তৌহিদ আলম বলেন, জুমার নামাজের কারণে গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ তখন মসজিদে ছিলেন। শিশুরা কাউকে না জানিয়ে নদীতে গোসল করতে গিয়েছিলো। পরে তারা পানিতে ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়।
দেবিনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আ গ ম সাহেদুল আলম বিশ্বাস পলাশ বলেন, পদ্মার শাখা নদীতে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের লাশ দাফনের প্রস্তুতি চলছে। নৌ পুলিশ নিহত শিশুদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেয়ার কথা জানিয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. একরামুল হোসাইন পাঁচ মেয়েশিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, লাশ দাফনের অনুমতি দেয়া হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। তারা সেখানে পৌঁছে ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবে এবং পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন ঘটনাটিকে অত্যন্ত মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এত অল্প বয়সী পাঁচ শিশুর একসঙ্গে প্রাণহানির ঘটনায় উপজেলা প্রশাসন গভীরভাবে শোকাহত। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা নেই।
তিনি আরও জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত শিশুদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দেয়া হয়েছে। প্রশাসন শোকাহত পরিবারগুলোর পাশে রয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























