হামের ছোবলে বিপর্যস্ত দেশ, আইসিইউ সংকটে ঝুঁকিতে শিশুদের জীবন
দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা, আর সেই চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। বিশেষ করে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট-এ পরিস্থিতি এখন সবচেয়ে সংকটাপন্ন।
রোববার (২৯ মার্চ) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, গত কয়েক দিনে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে হামে আক্রান্ত শিশু। বর্তমানে সেখানে অন্তত ৩৭ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় একজনের মৃত্যু হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুর বয়স নয় মাসের কম। এদের অনেকেরই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) ও পেডিয়াট্রিক আইসিইউ (পিআইসিইউ) প্রয়োজন হলেও পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় কাউকেই সে সাপোর্ট দেয়া যাচ্ছে না। আইসিইউর জন্য দীর্ঘ সিরিয়াল থাকলেও কবে নাগাদ সুযোগ মিলবে—তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না চিকিৎসকেরা।
অভিভাবকদের দুর্ভোগও চরমে পৌঁছেছে। কুষ্টিয়া থেকে আসা এক বাবা জানান, তার নয় মাসের শিশুটি আগে অন্য হাসপাতালে ভর্তি ছিলো, সেখান থেকেই সম্ভবত সংক্রমণ ছড়িয়েছে। একইভাবে কিশোরগঞ্জ থেকে আসা আরেক অভিভাবক তার সাড়ে তিন মাস বয়সী শিশুর জন্য পিআইসিইউ খুঁজতে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন, কিন্তু কোথাও জায়গা পাচ্ছেন না।
গাজীপুর থেকে আসা আরেক অভিভাবক জানান, হঠাৎ সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় আলাদা ইউনিট খোলা হলেও এখনও আইসিইউ বা পিআইসিইউ সুবিধা চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
চিকিৎসকেরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১৩ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে। হাঁচি-কাশি বা সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এ রোগ। এর জটিলতায় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহও হতে পারে।
শিশু সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, বিগত বছরের তুলনায় এবার সংক্রমণ অনেক বেশি এবং এটি ধীরে ধীরে মহামারির রূপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, হামের রোগীদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা আইসিইউ প্রয়োজন, যা দ্রুত স্থাপন করা গেলে এক সপ্তাহের মধ্যেই সেবা চালু করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতির পেছনে বড় কারণ টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি। করোনাভাইরাস মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় একটি বড় গ্যাপ তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক শিশুই নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি এবং এখন তারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে অনেকেই হামের টিকা নেয়নি, যা বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। সংকট মোকাবিলায় ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে নতুন করে টিকা কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তবে চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা—দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। টিকাদানের হার বাড়ানো এবং জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত না করা গেলে শিশুদের জন্য এ সংকট বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
সবার দেশ/কেএম




























