দিল্লিতে ৭০০ মুসলিম পরিবার উচ্ছেদের উদ্যোগ, মসজিদেও নোটিশ
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ঐতিহাসিক রেস কোর্স মসজিদসংলগ্ন এলাকা থেকে প্রায় ৭০০ পরিবারকে উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের বলে দাবি করা হয়েছে। উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে মসজিদের জমি খালি করার নোটিশ দেয়ার ঘটনায় ধর্মীয় স্থাপনার ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে মসজিদসংলগ্ন এলাকার কিছু স্থাপনা ভেঙে ফেলার দৃশ্য দেখা গেছে। সেখানে ইটের স্তূপ ও ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উচ্ছেদ কার্যক্রমের আগে এলাকার পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থাপনা খালি করার নোটিশও টাঙানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এলঅ্যান্ডডিও) রেস কোর্স মসজিদসংলগ্ন জমিকে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে দাবি করছে। জমিতে অননুমোদিত নির্মাণ কিংবা দখলকে বেআইনি উল্লেখ করে সেখানে নোটিশ দেয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত নির্দেশ কার্যকর করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় গণপূর্ত বিভাগকে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নিউ দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের (এনডিএমসি) কর্মকর্তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশ অনুসারে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, তুঘলক রোড থানার পুলিশ ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দাদের জন্য দিল্লির মুন্ডকা এলাকায় বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে ওই এলাকায় স্থানান্তরের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সেখানে যেতে সম্মত কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
রেস কোর্স মসজিদ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মসজিদের ইমামের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র ছয় দিনের নোটিশে জায়গা খালি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মসজিদটি ওয়াকফ বোর্ডের অধীনে নিবন্ধিত এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে তালিকাভুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে।
ইমাম জানান, উচ্ছেদসংক্রান্ত বিষয়ে আইনি সহায়তা চেয়ে দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডের কাছে আবেদন করা হলেও তারা প্রত্যাশিত সহায়তা পাননি। এদিকে এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং পানি-বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার মধ্যেও কয়েকজন মুসল্লি মসজিদে নামাজ আদায় করেছেন। প্রশাসনের পদক্ষেপকে ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন করার ঘটনা হিসেবে দেখছেন তারা।
এ ঘটনায় জমির মালিকানা, মসজিদের আইনগত অবস্থান এবং বসবাসকারী পরিবারগুলোর পুনর্বাসন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উচ্ছেদ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ, সংশ্লিষ্ট জমির নথিপত্র এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের আইনি অধিকার কীভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসা জরুরি।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম পরিবার ও স্থাপনা উচ্ছেদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, প্রশাসনিক অভিযানের মাধ্যমে মুসলিমদের বসতি, দোকানপাট ও ধর্মীয় স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
সম্প্রতি আসামে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার নেতৃত্বাধীন সরকার বনভূমি থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদের নামে কয়েকটি জেলায় অভিযান চালিয়েছে। রাজ্য প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, এক সপ্তাহে ৬৩৮ হেক্টরের বেশি জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে। এসব অভিযানে এক হাজারের বেশি মুসলিম পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পশ্চিমবঙ্গেও মুসলিম-অধ্যুষিত একটি কলোনিতে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ সামনে এসেছে। দিল্লি ও আসামের ঘটনাগুলোর প্রতিবাদে বিভিন্ন মানবাধিকার ও ছাত্রসংগঠন সরব হয়েছে। তাদের দাবি, উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সবার জন্য সমান আইনি সুরক্ষা, যথাযথ নোটিশ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
দিল্লির রেস কোর্স মসজিদসংলগ্ন উচ্ছেদ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে প্রশাসনের বক্তব্যের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, জমির মালিকানার নথি এবং আদালতের নির্দেশের বিস্তারিত যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রায় ৭০০ পরিবারের আবাসন, জীবিকা ও ধর্মীয় অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সবার দেশ/কেএম




























