Sobar Desh | সবার দেশ ড. মাহরুফ চৌধুরী


প্রকাশিত: ০২:০২, ৫ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের ইতিহাসের অনন্য মাইলফলক

চব্বিশের জুলাই রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি

চব্বিশের জুলাই রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি
ছবি: সবার দেশ

ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর গতিশীলতা। ইতিহাস কখনও স্থির নয়; এটি অবিরাম পরিবর্তন, অভিযোজন ও পুনর্গঠনের এক চলমান প্রক্রিয়া। একটি জাতির ইতিহাস কখনোই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়; এটি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, অর্জন এবং আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক অভিযাত্রা। 

কোনও জাতি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না। সময়ের প্রবাহে নতুন বাস্তবতা, নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন সংকট এবং নতুন প্রত্যাশার মুখোমুখি হতে হয়। সে পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার সক্ষমতাই নির্ধারণ করে একটি জাতির অগ্রযাত্রার দিকনির্দেশনা। যে জাতি অতীতের অভিজ্ঞতা ও অর্জনকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই কথা বলে। পক্ষান্তরে, যে জাতি অতীতের গৌরবকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ না করে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্রে পরিণত করে, নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও দ্বন্দ্বকে স্থায়ী করে তোলে, তারা একসময় অগ্রগতির পথ হারিয়ে ফেলে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো অতীতকে অস্বীকার করা যেমন আত্মঘাতী, তেমনি অতীতের মধ্যেই বন্দি হয়ে থাকাও সমান ক্ষতিকর।

পলাশী-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৪৭-পূর্ব ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম, তারপর ১৯৭৪-উত্তর ভাষার জন্য সংগ্রাম, রাজনৈতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সংগ্রাম, আত্মনিয়ন্ত্রণের তথা স্বাধিকারের সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম- এর সবকিছু মিলিয়েই আমাদের জাতীয় ইতিহাস নির্মিত হয়েছে। এ ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পূর্ববর্তী অধ্যায়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। 

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তার আত্মপরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করেছে; ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সুসংহত করেছে; ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান গণশক্তির সক্ষমতাকে প্রকাশ করেছে; আর ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ সেই দীর্ঘ সংগ্রামকে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পরিণতি দিয়েছে।

নিঃসন্দেহে স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় এবং নির্ধারক মাইলফলক, যার মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এবং বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একটা জাতির ইতিহাসের পথচলা কোনও একক ঘটনার মধ্যেই থেমে থাকে না। ১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজ-উদ্দৌলার পরাজয় যেমন এ অঞ্চলে একটি দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা করেছিলো এবং তার অভিঘাত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাতির জীবনকে প্রভাবিত করেছে, তেমনি ১৯৭১ সালের বিজয়ও কোনও চূড়ান্ত সমাপ্তি ছিলো না। 

স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে একটি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়, কিন্তু সে রাষ্ট্রকে কতটা ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন করা যাবে সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার সংগ্রাম তখনই শুরু হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, স্বাধীনতা একটি ঘটনা; কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সে প্রক্রিয়ায় কখনও অগ্রগতি আসে, কখনও পশ্চাৎপদতা দেখা দেয়; কখনও জনগণের আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নেয়, আবার কখনও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন সে অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বৈরাচারী ভূমিকায় জালেম শাসক শ্রেণীর যাতাকলে পিষ্ট মজলুম জনগণ মুক্তির পথ খোঁজে গণঅভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লবের পথে।
 
এ কারণেই স্বাধীনতা কোনও গন্তব্য নয়; এটি রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, জনগণের অধিকার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ যাত্রার সূচনা মাত্র। একটি জাতির ইতিহাসের ক্রমধারায় নতুন নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটে, এবং তাদের সামনে নতুন প্রশ্ন ও নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়। ফলে স্বাধীনতার মৌলিক চেতনা তথা মানবিক মর্যাদা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সাম্য প্রভৃতি বিষয় প্রতিটি যুগে নতুন বাস্তবতায় নতুনভাবে ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নের দাবি তোলে। 

বাংলাদেশের ইতিহাসও সে ধারাবাহিকতার বাইরে নয়। তাই আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান অভিযাত্রা হিসেবে দেখতে হবে যেখানে প্রতিটি সংগ্রাম পূর্ববর্তী সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করে এবং পরবর্তী সংগ্রামের ভিত্তি নির্মাণ করে। এ ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রবাহের মধ্যেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে; একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ও সমাজকে আরও ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত করার দীর্ঘ অভিযাত্রার একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে।

বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা একই বাস্তবতা দেখতে পাই। কোনও জাতির ইতিহাসে একটি বড় অর্জন কখনোই চূড়ান্ত পরিণতি নয়; বরং তা নতুন সংগ্রাম, নতুন দায়িত্ব এবং নতুন প্রত্যাশার সূচনা করে। ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির পথ খুলে দিলেও সেখানে নাগরিক অধিকার, বর্ণসমতা এবং গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে দীর্ঘ সংগ্রাম অব্যাহত ছিলো। স্বাধীনতার প্রায় দুই শতাব্দী পরও আফ্রিকান-আমেরিকানদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে ব্যাপক নাগরিক অধিকার আন্দোলন গড়ে উঠতে হয়েছে। একইভাবে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মহান আদর্শ সামনে নিয়ে এলেও গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সুসংহত করতে ফরাসি সমাজকে বহু উত্থান-পতন, সংঘাত ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনের পরও সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে নতুন সংগ্রামের সূচনা হয়েছে। ইতিহাসের এ অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের শেখায় যে রাজনৈতিক মুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, কিন্তু সে অর্জনের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

ইতিহাসের প্রতিটি বিজয় নতুন দায়িত্বের জন্ম দেয়, প্রতিটি অর্জন নতুন প্রত্যাশাকে সামনে নিয়ে আসে। কোনও জাতি যদি অর্জনের স্মৃতিকে সংরক্ষণ করেই সন্তুষ্ট থাকে, কিন্তু সে অর্জনের অন্তর্নিহিত আদর্শ বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর না হয়, তাহলে ইতিহাসের অগ্রযাত্রা থমকে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনও কারণ নেই। ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে  গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের যে স্বপ্ন জনগণ লালন করেছিল তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনও একটি চলমান প্রক্রিয়া। ফলে রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে যখনই সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক বেড়েছে, তখনই নতুন করে পরিবর্তনের দাবি উত্থাপিত হয়েছে। 

এ প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা, আকস্মিক বিস্ফোরণ বা সাময়িক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘ বিবর্তনধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ও বিশেষ অধ্যায়। এটি এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন নতুন প্রজন্ম রাষ্ট্রের সামনে জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা, ন্যায্য অধিকার এবং নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নগুলোকে নতুন করে উত্থাপন করেছে। যে প্রশ্নগুলো এক অর্থে স্বাধীনতার মূল চেতনার সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত, কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন ভাষা, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনরায় উচ্চারিত হয়েছে।

২০২৮-এর এ গণঅভ্যুত্থান বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্মের সে ঐতিহাসিক ভূমিকাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা যুগে যুগে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, যখন ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন জবাবদিহিতার পরিসর সংকুচিত করে, যখন নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে এবং যখন ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হতে থাকে, তখন পরিবর্তনের দাবি সবচেয়ে জোরালোভাবে উচ্চারিত হয় তরুণদের কণ্ঠে। কারণ তরুণেরা কেবল বর্তমানের প্রতিনিধিত্ব করে না; তারা ভবিষ্যতের দাবিদার এবং অংশীদারও বটে। তাদের স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং বঞ্চনার অভিজ্ঞতা সমাজের গভীর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে দৃশ্যমান করে তোলে। ফলে ইতিহাসের প্রতিটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের পেছনে তরুণদের সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। 

ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের আন্দোলন সব ক্ষেত্রেই তরুণেরাই অগ্রণীর ভূমিকা পালন করেছে। তারাই সাহসিকতার সঙ্গে প্রচলিত বাস্তবতাকে প্রশ্ন করেছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আত্মত্যাগের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। 

বাংলাদেশের রাজনৈতিকপট পরিবর্তনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্রআন্দোলনও সে দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারারই অংশ, যেখানে নতুন প্রজন্ম কেবল একটি তাৎক্ষণিক দাবির জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্র নিয়ে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সে কারণেই জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ নিয়ে জনগণের নতুন আকাঙ্ক্ষা এবং বিশেষত তরুণ প্রজন্মের ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। 

আমাদের জাতীয় জীবনের প্রায় প্রতিটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো তরুণদের সাহস, স্বপ্ন এবং আত্মত্যাগ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখেও তরুণ ছাত্রসমাজ মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তারুণ্যের নেতৃত্বেই স্বৈরশাসনের ভিত কেঁপে উঠেছিলো। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অসংখ্য তরুণ অস্ত্র হাতে নিয়ে স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলো। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রসমাজ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। একই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনও প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের ইতিহাসে পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি এখনও তরুণ প্রজন্ম। যুগ বদলেছে, প্রেক্ষাপট বদলেছে, কিন্তু ন্যায়, মর্যাদা এবং অধিকারের প্রশ্নে তারুণ্যের ঐতিহাসিক ভূমিকা অপরিবর্তিত রয়েছে।

সঙ্গত কারণে তরুণেরা সাধারণত বিদ্যমান ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার সাহস রাখে। তারা প্রতিষ্ঠিত সত্য তথা বন্দোবস্তকে অন্ধভাবে মেনে নিতে চায় না; বরং বাস্তবতার সঙ্গে আদর্শের ফারাককে চিহ্নিত করতে চায়। তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ কল্পনার শক্তি থাকে, নতুন সম্ভাবনা নির্মাণের সাহস থাকে এবং প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতাও থাকে। 

জার্মান বংশোদ্ভুত মার্কিন রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হানা আরেন্টের (১৯০৬–১৯৭৫) মতে, প্রতিটি নতুন প্রজন্ম পৃথিবীতে নতুন সূচনার সম্ভাবনা নিয়ে আসে। ইতিহাসের নানা পর্যায়ে আমরা দেখেছি, সমাজ যখন স্থবির হয়ে পড়ে বা রাষ্ট্র যখন জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে, তখন সে নতুন সূচনার আহ্বান সবচেয়ে প্রবলভাবে এসেছে তরুণদের কাছ থেকেই। 

বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানও সে অর্থে কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিলো না; এটি ছিলো নতুন প্রজন্মের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের উদ্দেশে একটি মৌলিক প্রশ্ন: রাষ্ট্র কার জন্য, ক্ষমতা কার স্বার্থে এবং স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কী? সে যাই হোক, ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনা-পরম্পরা নয়; এটি বর্তমানের রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ক্ষমতার রাজনীতিতে অতীতের স্মৃতি প্রায়ই মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়। ইতিহাস তখন শুধু গবেষণা, বিশ্লেষণ বা শিক্ষা গ্রহণের বিষয় থাকে না; বরং রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন, জনসমর্থন সংগঠিত করা এবং নৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে। 

আরও পড়ুন <<>> চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও প্রবাসীদের ঘুমহীন রাত

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়োর (১৯৩০–২০০২) ভাষায়, এটি এক ধরনের ‘প্রতীকী পুঁজি’ (সিম্বোলিক ক্যাপিটাল), যার মাধ্যমে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের বৈধতা ও মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত এবং পুনরুৎপাদন করার চেষ্টা করে। অর্থনৈতিক পুঁজি যেমন সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তেমনি প্রতীকী পুঁজি মানুষের চিন্তা, আবেগ ও স্মৃতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে। 

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাসকে প্রতীকী পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা কমবেশি বিদ্যমান। মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, জনগণের সংগ্রাম কিংবা রাষ্ট্রগঠনের বিভিন্ন অধ্যায়কে অনেক সময় এমনভাবে ব্যাখ্যা ও উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন সেগুলোর ওপর কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি, পরিবার, দল বা গোষ্ঠীর একচ্ছত্র মালিকানা রয়েছে। ফলে জাতীয় ইতিহাস, যা হওয়া উচিত ছিলো সমগ্র জাতির সম্মিলিত উত্তরাধিকার, তা অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ইতিহাসের বহুমাত্রিক বাস্তবতা এবং জনগণের সম্মিলিত অবদানকে আড়াল করে একদিকে একে সংকীর্ণ দলীয় বয়ানের মধ্যে আবদ্ধ করার প্রবণতা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করেছে এবং অপরদিকে ইতিহাসের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এ কারণেই ইতিহাসকে কোনো একক ব্যক্তি, দল বা প্রজন্মের সম্পত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
 
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ কিংবা ২০২৪ বাংলাদেশের ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় হলেও একই জাতীয় অভিযাত্রার গতিধারায় ভিন্ন ভিন্ন মাইলফলক। একটির গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটির গুরুত্ব খাটো করার চেষ্টা যেমন ইতিহাসবিরোধী, তেমনি একটি অর্জনকে অন্য অর্জনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানোও জাতির জন্য ক্ষতিকর। ইতিহাসের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার ধারাবাহিকতার মধ্যে। যে জাতি তার অতীতের বিভিন্ন সংগ্রামকে পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরস্পর-সম্পূরক হিসেবে দেখতে শেখে, সে জাতিই ভবিষ্যতের জন্য একটি সুদৃঢ় ভিত্তি নির্মাণ করতে সক্ষম হয়। 

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এ উপলব্ধি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যও ঠিক এ বৃহত্তর ধারাবাহিকতার মধ্যেই নিহিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে একদেশদর্শিতার ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চার স্বাভাবিক ও বহুমাত্রিক বিকাশ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত হয়েছে। ইতিহাস নিয়ে মুক্ত গবেষণা, যুক্তিনির্ভর বিতর্ক এবং সমালোচনামূলক আলোচনা উৎসাহিত হওয়ার পরিবর্তে অনেক সময় তা রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। ফলে ইতিহাসের নানা স্তর, নানা অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন প্রজন্মের অবদানকে সমন্বিতভাবে মূল্যায়নের পরিবর্তে একরৈখিক ব্যাখ্যার প্রবণতা শক্তিশালী হয়েছে। 

ইতিহাসের রাজনীতিকীকরণ ও ইতিহাসকে প্রতীকী পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সংহতি এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির। কারণ ইতিহাস যখন সমগ্র জাতির অভিন্ন উত্তরাধিকার না হয়ে কোনও বিশেষ রাজনৈতিক শক্তির দলীয় সম্পদে পরিণত হয়, তখন নাগরিকদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে, পারস্পরিক আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে। ইতিহাসের মূল কাজ হওয়া উচিত জাতিকে সংযুক্ত করা; কিন্তু যখন ইতিহাসকে বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা উল্টো জাতিকে বিভাজিত করে। 

এ বাস্তবতাকে বোঝার জন্য ‘স্মৃতির রাজনীতি’ (পলিটিক্স অব মেমোরি)-এর ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই অতীতের নির্দিষ্ট ঘটনাকে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতার প্রধান উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। ফলে ইতিহাসের কিছু অংশ অতিরঞ্জিতভাবে সামনে আসে, আবার কিছু অংশ আড়ালে চলে যায়। জাতীয় স্মৃতিকে তখন একটি জীবন্ত ও বহুমাত্রিক উত্তরাধিকার হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা রক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাতেও দীর্ঘদিন ধরে এ প্রবণতার বিভিন্ন প্রকাশ দেখা গেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস, যা সমগ্র জাতির সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফসল, তাকে অনেক সময় এমনভাবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যেন তার ব্যাখ্যা দেয়ার নৈতিক অধিকার কেবল বিশেষ কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে ন্যস্ত।

এ প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ জুলাই আন্দোলন কোনও একক রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা সংগঠনের একচ্ছত্র উদ্যোগ ছিলো না। এর প্রাণশক্তি ছিল সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, যেখানে নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পটভূমির মানুষ একটি অভিন্ন আকাঙ্ক্ষাকে সামনে নিয়ে একত্রিত হয়েছিলো। ফলে জুলাইয়ের ইতিহাসকে কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ‘প্রতীকী পুঁজি’ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করার সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই সীমিত হয়ে গেছে। সর্বস্তরের মানুষের এ গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ইতিহাসের প্রকৃত মালিক কোনও দল নয়, দেশের জনগণ; আর গণআন্দোলনের প্রকৃত শক্তি কোনো সংগঠনের একক কর্তৃত্বে নয়, বরং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে নিহিত। 

কিন্তু দুঃখজনকভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপরই একটি রাজনৈতিক প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যেনো স্বাধীনতার চেতনা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। একদিকে কেউ কেউ জুলাইয়ের তাৎপর্য প্রতিষ্ঠার নামে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে খাটো করতে চেয়েছেন; অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিকে সামনে এনে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। উভয় প্রবণতাই ইতিহাসের প্রকৃত স্বরূপকে অস্বীকার করে, যুক্তির বিচারে অসংগত এবং জাতীয় স্বার্থের ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতার পরিপন্থী। 

প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ এবং ২০২৪ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাস নয়; বরং একই জাতীয় অর্জনের অব্যাহত অভিযাত্রার ভিন্ন দুই অধ্যায়। ১৯৭১ আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে, আর ২০২৪ সে স্বাধীন রাষ্ট্রকে আরও বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং স্বৈরাচারমুক্ত করার গণআকাঙ্ক্ষাকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি অর্জনকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্য অর্জনকে অস্বীকার করার চেষ্টা ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে না; বরং জাতির সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে। আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রসংস্কারের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিলো, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো দুটি মৌলিক দাবি- একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রযন্ত্র এবং একটি স্বৈরাচারমুক্ত শাসনব্যবস্থা। এ আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবেই ‘জুলাই সনদ’-এর ধারণা সামনে আসে, যার লক্ষ্য ছিলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি নির্মাণ করা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্রসংস্কার থেকে সরে গিয়ে ইতিহাসের মালিকানা নিয়ে প্রতিযোগিতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সে সংস্কার-এজেন্ডা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে যে তরুণেরা জুলাইয়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলো রাষ্ট্র পুনর্গঠনের স্বপ্ন নিয়ে, তাদের অনেক প্রত্যাশাই অপূর্ণ থেকে যায়; পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন বন্দোবস্ত নির্মাণের যে প্রত্যয় আন্দোলনের ভেতরে জন্ম নিয়েছিলো, তার বাস্তবায়ন নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হয়।

তবে স্বীকার করতে হবে যে, এসব সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতার মধ্যেও জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন কিন্তু অন্যত্র। এ গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের জনগণকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস কোনও ঐতিহাসিক স্মৃতির একক ব্যাখ্যা নয়; বরং জনগণের অব্যাহত সম্মতি, অংশগ্রহণ এবং আস্থার ওপরই রাষ্ট্রযন্ত্রের কিংবা সরকারের শক্তি নির্ভর করে। কোনও শাসকগোষ্ঠী অতীতের গৌরব, ঐতিহাসিক অবদান কিংবা রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কথা যতই উচ্চারণ করুক না কেনো, বর্তমানের জনগণের বাস্তব আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদে শাসন ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠির প্রকৃত শক্তি জাতির অতীতের স্মৃতিতে নয়, বরং বর্তমানের জনগণের বিদ্যমান আস্থায় নিহিত। জুলাই সে সত্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে যেমন উন্মোচিত করেছে, তেমনি সমগ্র জাতিকেও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ন্যায়, ইনসাফ এবং নাগরিক মর্যাদাভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের সংগ্রাম কখনো অতীতের কোনো অর্জনের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সে অর্জনেরই যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক পরিণতি।

ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়মেই একটি বড় অর্জন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন দায়িত্ব ও নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়েছে; দিয়েছে একটি ভূখণ্ড, একটি পতাকা এবং বিশ্বের মানচিত্রে একটি সার্বভৌম পরিচয়। স্বাধীনতার জন্য যেসব বীর শহীদ জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের আত্মত্যাগ ছাড়া বাংলাদেশের অস্তিত্ব কল্পনা করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের ভিত্তি, আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রধান উৎস এবং আমাদের রাষ্ট্রীয় যাত্রার সূচনাবিন্দু। কিন্তু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সে রাষ্ট্রকে কীভাবে পরিচালিত করা হবে, কীভাবে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা হবে, কীভাবে ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে এবং কীভাবে স্বাধীনতার সুফল সকল নাগরিকের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে এসব প্রশ্নও স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য কেবল তার অস্তিত্বে নয়; বরং সে রাষ্ট্র তার জনগণের জন্য কতটা ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত। আর এ জায়গাতেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিহিত। এটি ১৯৭১-এর বিকল্প নয়; বরং ১৯৭১-এর অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটি নতুন ঐতিহাসিক প্রকাশ। ১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, আর ২০২৪ সে স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে জনগণের নতুন করে প্রশ্ন তোলার সাহস দিয়েছে। 

স্বাধীনতার অর্থ কেবল একটি রাষ্ট্রের জন্ম নয়; বরং সে রাষ্ট্রে নাগরিকের মর্যাদা, ন্যায়বিচার, সমতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা। একটি রাষ্ট্রের বাহ্যিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার নাগরিকরা অভ্যন্তরীণভাবে স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ এবং অধিকারসম্পন্ন জীবনযাপনের সুযোগ লাভ করে। এ অর্থে ২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ‘রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি’। যুগসন্ধি এমন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন পুরোনো বাস্তবতা ও নতুন সম্ভাবনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়; যখন একটি সমাজ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য নতুন পথ নির্মাণের সুযোগ লাভ করে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানও তেমন একটি সন্ধিক্ষণ, যেখানে জনগণের একটি বড় অংশ কেবল সরকার পরিবর্তনের দাবি করেনি; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের দাবি তুলেছে। তাদের প্রত্যাশা ছিলো এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিক পরিচয় কোনও বিশেষ সুবিধা বা বৈষম্যের ভিত্তি হবে না; যেখানে আইন সবার জন্য সমান হবে; যেখানে ক্ষমতা জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক থাকবে।
 
চব্বিশের জুলাইয়ের প্রকৃত ঐতিহাসিক সাফল্য কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার ব্যবহার পদ্ধতির বড় কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে প্রকৃত রূপান্তর কেবল শাসকের পরিবর্তনে আসে না; আসে জনগণের রাজনৈতিক চেতনার পরিবর্তনের মাধ্যমে। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এটি সাধারণ মানুষকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে রাষ্ট্র কোনও শাসকগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র জনগণের, এবং জনগণই তার প্রকৃত মালিক। এটি নাগরিকদের মধ্যে সে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে যে অন্যায়, বৈষম্য এবং জবাবদিহিতাহীনতার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাদের রয়েছে। এ চেতনার মূল্য দীর্ঘমেয়াদি। কারণ একটি গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল তার তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ফলাফলে পরিমাপ করা যায় না; বরং পরিমাপ করা হয় সমাজের চিন্তা, মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক আচরণে তার প্রভাবের মাধ্যমে। জুলাইয়ের উত্তরাধিকার নিহিত রয়েছে সে নতুন প্রত্যাশার মধ্যে, যেখানে তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রকে কেবল ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়। প্রকৃতপক্ষে এ আকাঙ্ক্ষাই জুলাইকে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক মাইলফলকে পরিণত করেছে।

রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ১৯৭১ এবং ২০২৪-কে মুখোমুখি দাঁড় করানোর যেকোনও অপচেষ্টাই ইতিহাসের প্রতি অবিচার। একটি জাতির শক্তি তার অর্জনগুলোকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার মধ্যে নয়; বরং সেগুলোকে একই ঐতিহাসিক অভিযাত্রার ধারাবাহিক মাইলফলক হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যেই নিহিত। ১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে, আর ২০২৪ আমাদের সে স্বাধীনতাকে আরও অর্থবহ, ন্যায়ভিত্তিক ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তাই জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপরীতে নয়, বরং স্বাধীনতার চেতনাকে আরও গভীর ও পূর্ণাঙ্গ করার ইতিহাসের একটি অনিবার্য অধ্যায় হিসেবেই মূল্যায়ন করতে হবে। আর সেটি করতে হলে বর্তমান বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতীতের বিতর্ক, বিভাজন ও স্মৃতির রাজনৈতিক ব্যবহারে আটকে না থেকে ভবিষ্যৎ নির্মাণে মনোনিবেশ করা। 

ইতিহাসের স্মৃতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ একটি জাতি তার অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা লাভ করে। কিন্তু স্মৃতির বন্দিত্ব কখনও অগ্রগতির পথ তৈরি করতে পারে না। যে জাতি অতীতের গৌরব কিংবা বেদনার ব্যাখ্যা নিয়েই অনন্তকাল ব্যস্ত থাকে, কিন্তু বর্তমানের বাস্তব সমস্যা মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নির্মাণে ব্যর্থ হয়, সে জাতি ইতিহাসের গতিপথে পিছিয়ে পড়ে। অতীত আমাদের শক্তির উৎস হতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের বিকল্প হতে পারে না।

বাংলাদেশের সামনে আজ যে চ্যালেঞ্জগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো মূলত ভবিষ্যৎমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার সার্বজনীনতা, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিকাশ, টেকসই শিল্পায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জন প্রভৃতি ক্ষেত্রেই আমাদের সামনে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে। যদি একটি জাতি কেবল অতীতের অর্জনের মালিকানা নিয়ে বিতর্কে আবদ্ধ থাকে, তবে বর্তমানের বাস্তব সংকটগুলো অমীমাংসিত থেকে যায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার মূল্য দেয়। 

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার ইতিহাসের গৌরবে যেমন নিহিত, তেমনি নিহিত তার জ্ঞান, দক্ষতা, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সক্ষমতার মধ্যেও। এ প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে রাষ্ট্রসংস্কারের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিলো, তার গুরুত্ব বিশেষভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। জুলাইয়ের আন্দোলনের অন্যতম মৌলিক দাবি ছিলো এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে বৈষম্য, স্বেচ্ছাচারিতা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি দূর হবে। রাষ্ট্রসংস্কারের যে গভীর প্রত্যাশা নিয়ে তরুণ প্রজন্ম রাস্তায় নেমেছিলো, সে প্রত্যাশার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনও একটি অসমাপ্ত প্রক্রিয়া। 

পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পরিবর্তে একটি নতুন, অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক ও জনগণকেন্দ্রিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন জুলাইয়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছিলো, তা নানা রাজনৈতিক জটিলতা, মতপার্থক্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগিয়ে যেতে পারেনি। ফলে অনেক তরুণের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে: যে পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে তারা আত্মত্যাগ করেছে, সে পরিবর্তন কতটা বাস্তব রূপ লাভ করবে? তবে কোনও ঐতিহাসিক আন্দোলনের মূল্য কেবল তার তাৎক্ষণিক সাফল্য বা অসম্পূর্ণতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যায় না। ইতিহাসে বহু গণআন্দোলন প্রথম পর্যায়ে সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, কিন্তু তারা সমাজের চিন্তা, মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীর পরিবর্তনের সূচনা করেছে। 

জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই যে, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোনও রাষ্ট্র টেকসইভাবে গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক হতে পারে না। রাষ্ট্রসংস্কার কোনও একক সরকার, দল বা সময়ের কাজ নয়; এটি একটি চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের সকল অংশীজনের ভূমিকা রয়েছে।

আজকের তরুণ প্রজন্মের সামনে তাই দ্বৈত দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, ইতিহাসের বিকৃতি, কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা এবং অতীতের প্রতীকী পুঁজির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা; কারণ গণতান্ত্রিক সমাজে ইতিহাসের মালিকানা কোনও গোষ্ঠীর নয়, এটি জনগণের সম্মিলিত সম্পদ। দ্বিতীয়ত, কেবল প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্র নির্মাণের ইতিবাচক ও সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা। একটি উন্নত রাষ্ট্র কেবল স্লোগান, আবেগ বা প্রতিবাদের মাধ্যমে নির্মিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা, নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা এবং কঠোর পরিশ্রম। 

জুলাইয়ের চেতনা তখনই প্রকৃত অর্থে সফল হবে, যখন তা একটি নতুন নাগরিক সংস্কৃতির জন্ম দেবে যেখানে মানুষ অধিকার যেমন দাবি করবে, তেমনি দায়িত্বও পালন করবে; যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, জনগণের কল্যাণে পরিচালিত হবে; যেখানে রাষ্ট্রের লক্ষ্য হবে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়, বরং মানুষের মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে জুলাইয়ের শিক্ষা হবে শুধু পুরোনো ব্যবস্থার বিরোধিতা নয়, বরং একটি উন্নততর বিকল্প ব্যবস্থা নির্মাণের সক্ষমতা অর্জন করা। কারণ কোনও গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত সার্থকতা নিহিত থাকে কেবল অন্যায়ের পতনে নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক নতুন বাস্তবতা নির্মাণের সক্ষমতার মধ্যে।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের গর্ব; চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানও আমাদের গর্ব। একটি আমাদের স্বাধীন অস্তিত্বের ভিত্তি নির্মাণ করেছে, অন্যটি সে স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্র, কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মসমালোচনা এবং আত্মসংশোধনের শক্তিকে প্রকাশ করেছে। একটি আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার দরজা খুলেছে, অন্যটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে স্বাধীনতার সুফলকে অর্থবহ করতে হলে রাষ্ট্রকে হতে হবে বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণকেন্দ্রিক। এ দুটি ঘটনাই বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য ও অনিবার্য অংশ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণে উভয়ই আমাদের জন্য প্রেরণা, শিক্ষা ও দিকনির্দেশনার উৎস। অতএব, আমাদের সামনে পথ হতে হবে বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতি; প্রতিহিংসার সংস্কৃতির পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি; ‘প্রতীকী পুঁজি’ ব্যবহার করে ইতিহাসের একচেটিয়া মালিকানা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুমাত্রিক স্মৃতিচর্চার সংস্কৃতি; এবং অতীতের অন্তহীন বিতর্কে আবদ্ধ থাকার পরিবর্তে ভবিষ্যৎ নির্মাণের দৃঢ় অঙ্গীকার। 

ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা হলো একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন সে তার অতীতকে সম্মান করে, বর্তমানের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন স্বপ্ন নির্মাণ করে। চব্বিশের জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই কেবল একটি আন্দোলনের স্মৃতি নয়; এটি জনগণের রাজনৈতিক জাগরণ, অধিকার সচেতনতা এবং রাষ্ট্রকে আরও ন্যায়ভিত্তিক করার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এ চেতনাকে ধারণ করে স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে কঠোর পরিশ্রম, জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন, সুশাসন, উৎপাদনশীলতা এবং জাতীয় সংহতির নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের আগামীর পথচলার মূলমন্ত্র। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয় কোনও একটি মুহূর্তের সাফল্যে নয়; বরং সে মুহূর্তের চেতনাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস্তব জীবনে রূপ দেয়ার মধ্যেই নিহিত।

লেখক:
ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:

ছাত্রদলে নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষা, ক্লিন ইমেজের নেতৃত্বে জোর
নোয়াখালীতে প্রবাসীর স্ত্রীকে পিপ্তল ঠেকিয়ে চাঁদাবাজি
জবি ছাত্রদলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে: ভিসিকে প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি
বেনাপোল ইমিগ্রেশনে নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগ নেতা আটক
যুবদলের নেতৃত্বে আলিয়ার দখল নিলো ছাত্রদল, বিতাড়িত শিবির
জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে আসছে ‘জুলাই২৪’ ডিজিটাল স্মৃতি প্ল্যাটফর্ম
জনগণের সমর্থনেই সফল হয়েছে জুলাই আন্দোলন: প্রধানমন্ত্রী
চব্বিশের জুলাই রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি
ইরানের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণই চূড়ান্ত লক্ষ্য: মার্কো রুবিও
‘জুলাই আমাদের ঐক্য, সাহস ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক’
৩৬ জুলাই আজ, জনতার বিজয়ের দিনে মাফিয়া হাসিনার পলায়ন
দেশের বিভিন্ন স্থানে শিবির-ছাত্রশক্তির ওপর ছাত্রদল-যুবদলের হামলা
ওয়েস্ট ইন্ডিজের জবাবে দাপুটে পাকিস্তান
জাহের আলভীর জামিন লাভ
ওয়াশিংটনে ভয়াবহ দাবানল: পুড়ে ছাই ৭ শতাধিক বাড়ি