পক্ষে-বিপক্ষে তর্কের ঝড়
রাষ্ট্রপতি ও তাজুল ইসলাম ইস্যুতে উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়া
একদিনেই দুই ইস্যুতে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশের সোশ্যাল মিডিয়া। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন-এর এক সাক্ষাৎকার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম-কে সরিয়ে নতুন নিয়োগ—এ দুই ঘটনাকে ঘিরে ফেসবুক, এক্স (টুইটার) ও ইউটিউবে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার ঘিরে বিতর্ক
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) দেশের একটি গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর ভূমিকা নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেন। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, গত ১৮ মাসে রাজনৈতিক চাপ ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তাকে বিএনপি ও দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান সমর্থন দিয়েছেন এবং বিভিন্ন সংকটে পাশে ছিলেন।
রাষ্ট্রপতির এ বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক নেটিজেন প্রশ্ন তুলেছেন—রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক পদে থেকে এ ধরনের রাজনৈতিক মন্তব্য কতটা শোভন। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, এতে রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সরকার সমর্থকরা বলছেন, রাষ্ট্রপতি নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন মাত্র।
ড. ইউনূসের সমর্থকরা সোশ্যাল মিডিয়ায় রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের সমালোচনা করে পোস্ট দিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, দেশের সংকটময় সময়ে ড. ইউনূসের ভূমিকা ইতিবাচক ছিলো এবং তাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ নিয়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাল্টাপাল্টি যুক্তি, স্ট্যাটাস ও লাইভ আলোচনা চলছে।
তাজুল ইসলামকে অপসারণ নিয়ে প্রতিক্রিয়া
একই দিনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর পদ থেকে তাজুল ইসলামকে সরিয়ে অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম-কে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্তও সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
অনেকেই দাবি করছেন, চলমান গুরুত্বপূর্ণ মামলার মাঝপথে নেতৃত্ব পরিবর্তন অপ্রত্যাশিত। কেউ কেউ সরকারের বিরুদ্ধে ‘অকৃতজ্ঞতা’র অভিযোগ তুলে লিখছেন, কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালন করা একজন প্রসিকিউটরকে এভাবে সরানো ঠিক হয়নি। আবার অপর একটি অংশ বলছে, নতুন সরকার এলে গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।
তাজুল ইসলাম নিজেও সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচিত সরকার নিজেদের পছন্দের লোককে দায়িত্ব দেবে—এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। তিনি নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে স্বাগত জানান এবং নিজের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার আহ্বান জানান।
দুই ইস্যুতে বিভক্ত জনমত
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার এবং ট্রাইব্যুনালে নেতৃত্ব পরিবর্তন—দুই ঘটনাই দেশের চলমান রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে ঘটেছে। ফলে এগুলোকে ঘিরে জনমতের বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া পোস্টগুলোতে যেমন ক্ষোভ ও সমালোচনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে সমর্থন ও পাল্টা যুক্তিও। রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এ সময়ে অনলাইন পরিসরই হয়ে উঠেছে মতামত প্রকাশের প্রধান মঞ্চ।
‘সবার দেশ’ পাঠকদের জন্য নেটিজেনদের কিছু ভাইরাল পোস্ট হুবহু তুলে ধরা হলো।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেসসচিব তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, আমরা কি এখন সে চুপ্পুকে মহিমান্বিত করতে নেমেছি মুহাম্মদ ইউনূসকে ভিলিফাই করে? এতোটাই আত্মবিনাশী আমরা? গর্দিস আমাদের নসিবে থাকবে না তো, কার নসিবে থাকবে?
দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শীর্ষকর্মকর্তা তার ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, বাংলাদেশের জনগণ রাজনৈতিকভাবে সাধারণত দুইভাগে বিভক্ত: আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের পক্ষ (৩০%) ও বিপক্ষ (৭০%)। বিএনপি জন্মলগ্ন থেকে বিপক্ষ ধারার সবচেয়ে বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে, সফলতাও পেয়েছে। সমসাময়িক কালে দলটিকে দেখছি ৩০%-এ ভাগ বসাতে গিয়ে ৭০% এর বড় অংশ হারিয়ে ফেলার ঝুকি নিচ্ছে।
প্রবাস থেকে স্বপ্নীল সজিব লিখেছেন, বিএনপি ধীরে ধীরে গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে চলে যাবে এটা অনুমেয় ছিলো কিন্তু সবকিছু এতো দ্রুত হবে জানা ছিলো না। রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বক্তব্য যদি সত্য হয় তাহলে জুলাই আন্দোলনে নিহত হওয়া বিএনপির ৪৪২ জন কর্মীর জীবন একদমই বৃথা গেলো। নয়া ক্ষমতা, নয়া যৌবন; এখন হয়তো মানুষের ক্ষোভকে পাত্তা দিবেনা। ক্ষোভ জমতে জমতে যখন স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠবে সেদিন সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। পিছনে ফিরে দেখবে শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত ধুধু মরুভূমি। লজ্জা!
একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের জন্ম স্বাধীন বাংলাদেশে। তিনি কি বর্বর পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর পক্ষে ছিলেন? বা সহযোগী? জামাতের সাথে তার আদর্শগত মিল থাকতেই পারে। জামাতের ইসলাম ভিত্তিক রাজনীতি তিনি করতেই পারেন। তিনি কি এ পদে চুরি, মিথ্যা, বাটপারি বা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন? শুধুমাত্র জামাতী হিসাবে কেন তাকে বাদ দেয়ার চক্রান্ত করা হচ্ছে? আপাদমস্তক একজন জুলাই যোদ্ধা, একজন নিবেদিতপ্রাণ পেশাগত দক্ষ আইনজীবীকে কেন তার পদ হতে প্রত্যাহার করা হচ্ছে? এর পরিণাম হবে ভয়াবহ ইনশাআল্লাহ।
আরেকজন লিখেছেন, চিফ প্রসিকিউটর একজন দেশপ্রেমিক মানুষ, এদেশে চাটুকাররা ভালো থাকে, দেশপ্রেমিক হইলেই হয় জীবন দিতে হবে,না হয় বঞ্চনার শীকার হবে। আমরা কি আসলেই স্বাধীন? তিনি আরও লিখেছেন, Muhammad Yunus স্যার,
রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারটা পড়ে আপনার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা আরো বেড়ে গেলো...। আপনি যেখানেই থাকেন না কেনো,
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন আপনাকে ভালো রাখে- সে দোয়া থাকলো।
রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে একজন লিখেছেন, চুপ্পুর বক্তব্য ইতিহাসে স্থান করে নিলো। আজ থেকে হাজার বছর পরেও মানুষ জানবে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের সাথে কারা গাদ্দারি করেছিলো, কে সে দলের শীর্ষ নেতা?
তিনি আরও লিখেছেন, মানুষ এটাও জানবে কোন বিচার বন্ধ করার জন্য মানবতা বিরোধী ট্রাইবুনালের চীফ প্রসিকিউটর এডভোকেট তাজুল ইসলামকে সরানো হচ্ছে।
আরেকজন তার ওয়ালে লিখেছেন, ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করেনা। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা, ইতিহাস থেকে কেউ শিখে না। যেমন: বাপ-মায়ের পরিণতি দেখেও শিক্ষা হয়নি জুলাই বিপ্লবের নাম্বার ওয়ান গাদ্দারের।
তাজুল ইসলামকে অপসারণের সম্ভাব্য কারণ দেখিয়ে একজন লিখেছেন, তাজুল ইসলাম আওয়ামী লীগ এবং ভারতের কাছে এক আতঙ্কের নাম। কিন্তু হঠাৎ করে তিনি বিএনপির জন্য ‘বিষফোঁড়া’ হয়ে উঠলেন কী করে? কেনো তাকে বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে? এর নেপথ্যে কার ইশারা কাজ করছে? ‘ভারতের সন্তুষ্টি’?
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী এক প্রবাসী পোস্ট করেছেন, ধন্যবাদ চুপ্পু স্যার, আপনি মিডিয়াতে সাক্ষাতকার না দিলে চব্বিশ ও জুলাই বিধ্বংসী গাদ্দারদের মুখোশ কখনোই উন্মোচিত হতো না...
তিনি আরও লিখেছেন, জাতিকে বুঝতে হবে জয়বাংলার লোকে বিএনপি'র প্রশংসা করে। দেশবাসীকে এ ম্যাজিক বোঝার জন্য পারমাণবিক বিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। ‘ভারতমাতাকি জয়হীন্দ জয়বাংলা জিন্দাবাদ’।
আরেকজন লিখেছেন, প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের মাধ্যমে বিএনপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিরোধী দল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ এ গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির ৪২২ জন নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন—যা ইতিহাসের নির্মম সত্য।
দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রীসহ বিএনপির পদধারী কিছু নেতাকর্মী জুলাই নিয়ে অসংলগ্ন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দিয়ে চলেছেন, যা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর অবস্থান অব্যাহত থাকলে অচিরেই জনরোষের মুখে পড়তে হবে—এটি অনিবার্য। শেখ হাসিনার উচ্ছিষ্টও যদি আপনাদের হিরো হয়, তাহলে রাজনৈতিক ভাবে কতটা দেউলিয়া আপনারা ভেবে দেখেন।
এক প্রবাসী কবি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে লিখেছেন, ২০০০ লাশ ও ৩৯ হাজার পঙ্গুত্বের অস্তিত্ব শেষ! জুলাই আবার কি? বলেছিলাম না—জুলাইয়ের কোন অস্তিত্বই থাকবে না? জুলাইযোদ্ধাদের হত্যা করা হবে অথবা ফাঁসি দেওয়া হবে। এমন কি জুলাইয়ের নাম মুখে নেওয়াটাই হবে চরম রাষ্ট্রদ্রোহীতা৷ এবং সেটা তাদের দ্বারাই সংগঠিত হবে জুলাইয়ের রক্তে যারা মুক্ত হয়েছে৷ তাজুল, কামরুল, ভিসিদের অপসারণ সহ সকল রদ- বদল সেই প্লানেরই প্রামাণ্য খণ্ডাংশ মাত্র...এ তো মাত্র শুরুয়াত....
আরেকজন লিখেছেন, জুলাই পরবর্তী বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে স্থিতিশীল রাখা ও ভাঁড়তের করাল গ্রাস থেকে বের করে আনা ড. ইউনুস এখন জাতীয় ভিলেন! আর ফ্যাসিবাদীর দোসর চুপ্পু এখন জাতীয় বীর।
রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে একজন লিখেছেন- চুপ্পু বলেছে, শুধু বিদেশ না, বরং দেশের কোন অনুষ্ঠানেও আমাকে ইউনূস যেতে দেয় নাই। অভিনন্দন, প্রফেসর! চুপ্পুই প্রমাণ করে দিলো, আপনি জুলাইকে কতটা ধারণ করতেন। চুপ্পুর প্রতিটা কথায় প্রফেসর ইউনূসের প্রতি রাগ, ক্ষোভ উপচায় পড়তেসিল। এতেই প্রমাণ হয়, ইউনূস সাহেব আমাদের কতটা কাছের মানুষ ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, ইতিহাসে বন্ধুর চেয়ে শত্রুর কথার গুরুত্ব বেশি। রাষ্ট্রপতি চুপ্পুকে কারা শান্তির পরশ দিয়ে টিকিয়ে রেখেছিলো, আর কারা তাকে শান্তিতে থাকতে দেয় নাই, সে ইতিহাস আজ লেখা হলো। এখন অনেকেই অনেক কথাই বলবে। কিন্তু আজ থেকে ৫০ বছর পরে, ইনসাফের আয়নায় লেখা জুলাইয়ের ইতিহাসে স্পষ্ট লেখা থাকবে, ইউনূস সাহেব আমাদের সাথে বেঈমানি করেন নাই। হয়তো হাসিনার প্রিয়জনকে সরাতে পারেন নাই। তবে একমুহূর্তও তিনি উনাকে শান্তিতে থাকতে দেন নাই। জুলাই আর ইনকিলাবের পক্ষে ইউনূসের এ অবদান আমরা স্বর্ণের হরফে লিখে রাখব, ইনশাআল্লাহ। ইনকিলাব জিন্দাবাদ, প্রফেসর!! ইউ উইল বি রিমেম্বার্ড!!
পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় এবং সরকার এ বিতর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেয় কি না—এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
সবার দেশ/কেএম




























