Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০১:৩৪, ৮ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ০১:৩৬, ৮ আগস্ট ২০২৬

যেভাবে বদলে যায় বাংলাদেশের ইতিহাস

সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন

সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন
ছবি: সবার দেশ

আজকের পর্বে থাকছে: ক্যান্টনমেন্টের বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছিলো, শেখ হাসিনার দেশত্যাগ, ছাত্রনেতাদের আপত্তি, আসিফ মাহমুদের ফেসবুক লাইভ এবং বঙ্গভবনের নাটকীয় বৈঠকের বিস্তারিত।

(দ্বিতীয় পর্ব)

দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ঢল নামে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, গুলির শব্দ, বিক্ষোভ আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে শুরু হয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।

ক্যান্টনমেন্টে এক টেবিলে রাজনীতিকরা

৫ আগস্ট দুপুর ১টার পর থেকে সেনানিবাসে একে একে জড়ো হতে থাকেন দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।

অধ্যাপক আসিফ নজরুলও সেখানে যোগ দেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় পর্যন্ত শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েননি। তবে তিনি পদত্যাগ করবেন—এমন একটি বার্তা বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যাচ্ছিলো।

এ পরিস্থিতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে একটি প্রশ্ন—যদি প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন, তাহলে এরপর কী হবে?

আলোচনায় জরুরি অবস্থা জারি, সংসদ ভেঙে দেয়া এবং নতুন সরকার গঠনের সাংবিধানিক পথ নিয়ে মতবিনিময় হয়।

অধ্যাপক আসিফ নজরুল পরে জানান, আলোচনায় তখন নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে তেমন কোনও আলোচনা হয়নি। বরং মূল গুরুত্ব দেয়া হয়েছিলো ক্ষমতার সাংবিধানিক রূপান্তর এবং অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠনের প্রক্রিয়া কী হবে, সেটির ওপর।

তার ভাষায়, তখনকার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিলো একটি সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হতে না দেয়া।

বাইরে আন্দোলন, ভেতরে উদ্বেগ

ক্যান্টনমেন্টের বৈঠকের খবর ধীরে ধীরে আন্দোলনরত ছাত্রনেতাদের কাছেও পৌঁছে যায়।

সে সময় রাজধানীর চানখারপুল এলাকায় আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

তিনি পরে জানান, বিভিন্ন সূত্র থেকে তারা জানতে পারেন, রাজনৈতিক নেতারা সেনানিবাসে বৈঠকে বসেছেন।

এ সংবাদ তাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

আসিফ মাহমুদের আশঙ্কা ছিলো, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছে, সেটি হয়তো রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে অন্যদিকে মোড় নিতে পারে।

বিশেষ করে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কোনও সরকার কিংবা সামরিক প্রভাবাধীন রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে ছাত্রনেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।

‘দেশের ভবিষ্যৎ ক্যান্টনমেন্টে নির্ধারিত হবে না’

এ আশঙ্কার মধ্যেই আসিফ মাহমুদ সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে লাইভে আসেন।

লাইভে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন,

দেশের ভবিষ্যৎ ক্যান্টনমেন্ট থেকে ঠিক করা হবে না।

তার এ বক্তব্য দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

অন্যদিকে মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর পরে দাবি করেন, সামরিক শাসন কিংবা সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের প্রশ্নটি কখনও আলোচনায় ছিলো না।

তার মতে, পুরো আলোচনার উদ্দেশ্য ছিলো রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি সাংবিধানিক সমাধানের পথ বের করা।

গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি

আসিফ মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যান্টনমেন্টে উপস্থিত কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা শুরুতে দ্রুত একটি সমঝোতার পক্ষে ছিলেন।

তবে অন্য কয়েকজন নেতা স্পষ্টভাবে বলেন, জুলাই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন শিক্ষার্থীরা।

তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনও রাজনৈতিক সমঝোতা গ্রহণযোগ্য হবে না।

এ অবস্থানই পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কারণ এর ফলে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়।

বিকেল ৩টা ৯ মিনিট

বিকেল ৩টা ৯ মিনিট।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত।

এ সময় শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান ঢাকার আকাশ ত্যাগ করে।

কিছুক্ষণ পরই বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

এর প্রায় ৪০ মিনিট পরে, বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।

তিনি শেখ হাসিনার দেশত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান।

তার বক্তব্য প্রচারের পরই কার্যত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন বাস্তবতার সূচনা হয়।

ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবনের পথে

সেনাপ্রধানের বক্তব্যের পর রাজনৈতিক নেতারা সিদ্ধান্ত নেন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন।

উদ্দেশ্য ছিলো সংসদ ভেঙে দেয়ার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু করা এবং পরবর্তী সরকার গঠনের পথ সুগম করা।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে রাজনৈতিক নেতাদের বহর বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা হয়।

সে সময় দেশের রাস্তায় ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য।

লাখ লাখ মানুষ বিজয়ের উল্লাসে রাজপথে নেমে আসেন।

কোথাও মিছিল, কোথাও স্লোগান, কোথাও আবার পতাকা হাতে মানুষের ঢল।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটেছে—এমন বিশ্বাসে অনেকেই আনন্দ প্রকাশ করতে থাকেন।

তবে একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিলো অত্যন্ত নাজুক।

বিভিন্ন থানায় হামলা, অস্ত্র লুট, সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর এবং প্রশাসনিক শূন্যতার আশঙ্কা বাড়ছিলো।

এ বাস্তবতার মধ্যেই সন্ধ্যার পর বঙ্গভবনে শুরু হতে যাচ্ছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক, যেখানে নেয়া হবে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী কয়েকটি সিদ্ধান্ত।

সে বৈঠকেই খালেদা জিয়ার মুক্তি, সংসদ ভেঙে দেয়া, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং আলোচিত 'আয়নাঘর' ইস্যু নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।

যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

(চলবে)


তৃতীয় পর্বে থাকবে: বঙ্গভবনের বৈঠকের অন্দরমহল, খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্ত, আকাশসীমা বন্ধের নির্দেশ, 'আয়নাঘর' প্রসঙ্গ এবং ছাত্রনেতাদের বঙ্গভবনে ডাকার নেপথ্যের ঘটনা।

জনপ্রিয়

শীর্ষ সংবাদ:

৫ আগস্ট প্রাণনাশের শঙ্কায়ও দায়িত্বে ছিলাম: সাহাবুদ্দিন চুপ্পু
সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন
ভারতীয় হাইকমিশনকে তলবের দাবি নাহিদ ইসলামের
বিয়ের খাবার নিয়ে বর ও কনেপক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১০
সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সতর্ক করলো পুলিশ
বিএনপি আইসিইউতে গেলে আমি বাঁচাই: রুমিন ফারহানা
ইতালি বিমানবন্দরে ২৬০ যাত্রী নিয়ে আটকা ঢাকাগামী বিমান
হাসিনার সঙ্গে দেশে ফিরতে চান সাকিব
মিরপুরে বিএনপি নেতাকে গুলি করলো যুবলীগ
পাকিস্তানে বাংলাদেশের আনারস রফতানির দ্বার উন্মুক্ত
নরসিংদীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল
সরকারের ব্যর্থতায় দিল্লিতে প্রেস ব্রিফিং করেছেন হাসিনা: নাহিদ
বোমা হামলার শঙ্কায় দেশজুড়ে পুলিশের হাই অ্যালার্ট
ইয়েমেনে সেনা সমাবেশে হুতিদের হামলায় নিহত ৫৮
সিলেটে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ জনের প্রাণহানি
বগুড়ায় বাসচাপায় ৬ শ্রমিক নিহত, আহত ১৫
সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন