Sobar Desh | সবার দেশ কক্সবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০০:৩২, ৬ জুন ২০২৬

জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জাল এনআইডি-পাসপোর্ট চক্রের বিস্তার

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জাল এনআইডি-পাসপোর্ট চক্রের বিস্তার
ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জাল জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ভুয়া জন্মনিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট জালিয়াতি, মানবপাচার ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও বিভিন্ন জাল নথিসহ এক রোহিঙ্গা নাগরিকের গ্রেফতারের ঘটনায় ক্যাম্পভিত্তিক অপরাধ চক্রের বিস্তৃত কর্মকাণ্ড আবারও সামনে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযানে চক্রের সদস্যরা গ্রেফতার হলেও এসব অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ মে উখিয়ার লাম্বাশিয়া-১ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে মোহাম্মদ তোহা নামে এক রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে বাংলাদেশি টাকা, মার্কিন ডলার, মালয়েশিয়ান রিংগিত ও সৌদি রিয়ালসহ বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয় সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্রও জব্দ করা হয়।

প্রাথমিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে জাল এনআইডি ব্যবহার, ভুয়া জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি, মানবপাচার, মানি লন্ডারিং এবং জাল পাসপোর্ট প্রস্তুতকারী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে। এ ঘটনায় উখিয়া থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইয়ামিন সুমন জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহাম্মদ তোহা চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া এলাকার একটি ঠিকানা ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয়ে বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পাওয়া গেছে। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ প্রতিবেদন হাতে পেলে চক্রটির কার্যক্রম সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র রোহিঙ্গাদের জন্য জাল এনআইডি ও অন্যান্য পরিচয়পত্র তৈরির কাজ করে আসছে। এসব নথি ব্যবহার করে অনেক রোহিঙ্গা ব্যাংক হিসাব খোলা, মোবাইল সিম নিবন্ধন, পাসপোর্টের আবেদন এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধ নতুন নয়। ২০২১ সালে কক্সবাজারের চকরিয়ায় অভিযান চালিয়ে ওসমান গনি নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছিলো র‍্যাব। তার কাছ থেকে সাতটি জাল পাসপোর্ট, সাতটি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ভুয়া জন্মসনদ তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। তদন্তে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট তৈরিতে সহায়তা করতেন।

অন্যদিকে, সম্প্রতি টেকনাফের জাদিমুরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকা থেকে প্রায় এক কোটি টাকার জাল নোটসহ একটি চক্রের দুই সদস্যকে আটক করে বিজিবি। তাদের একজন রোহিঙ্গা বলে জানানো হয়। অভিযানে জাল নোট তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম, ল্যাপটপ, প্রিন্টার ও বিশেষ ওয়াটারমার্ক তৈরির উপকরণ উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীদের ধারণা, ঈদকে কেন্দ্র করে এসব জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা ছিলো।

এদিকে গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক এক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে সক্রিয় কিছু চক্র মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মানবপাচারের শিকার হয়ে সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বাধ্য হচ্ছেন রোহিঙ্গারা।

শুধু মানবপাচার বা জাল নথির বিষয় নয়, ক্যাম্পগুলোতে অস্ত্র উদ্ধার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য গ্রেফতারের ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। ২০২৫ সালে উখিয়ার একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বিদেশি উজি সাবমেশিনগান, নগদ অর্থ এবং অন্যান্য সামগ্রীসহ চারজন সন্দেহভাজন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যকে আটক করা হয়। তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে সীমান্তভিত্তিক অপরাধ ও অস্ত্র সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জাল এনআইডি, ভুয়া পাসপোর্ট, মানবপাচার, জাল মুদ্রা, অবৈধ আর্থিক লেনদেন এবং অস্ত্র চোরাচালান—সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে ঘিরে একটি বহুমাত্রিক অপরাধী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এ নেটওয়ার্ক শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, দেশের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্যও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।

তাদের মতে, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্ট যাচাই ব্যবস্থায় আরও কঠোরতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ আরও জটিল রূপ নিতে পারে।

সবার দেশ/কেএম

শীর্ষ সংবাদ:

সাড়ে ৮ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট ঘোষণা এনসিপির
ইউরোপে ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশের, তপু বর্মণের জোড়া গোল
শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন
বেনাপোলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল, আটক-২
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জাল এনআইডি-পাসপোর্ট চক্রের বিস্তার
বিশ্বকাপের আড়ালে মেক্সিকোয় মানবপাচার ও যৌন বাণিজ্যের বিস্তার
নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল, সরে গেলো পুলিশ
ভারতের নতুন ‘পুশইন’ চেষ্টা: ৪ সীমান্তে আটকা ৮৮ জন
বিশ্বকাপে ক্যানাডা কতটা শক্তিধর?
সিরাজগঞ্জের বাসচাপায় তিন ভ্যানযাত্রী নিহত
ইরান ইস্যুতে রিপাবলিকানদের বিভাজন, ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা
ভৈরবে দুই পক্ষের সংঘর্ষ; ৬ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক
বন্ধ কারখানা চালু করতে ২০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা
আইভীর বাড়ির সামনে পুলিশি নজরদারি