কাঙ্ক্ষিত ইলিশে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার আশা
নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে ফিরছেন ভোলার জেলেরা
২২ দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটল ভোলার জেলেদের। মা ইলিশের প্রজনন নিশ্চিতে জারি থাকা সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) মধ্যরাতে শেষ হয়েছে। শনিবার ভোর থেকেই মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার মোহনায় জাল-ট্রলার নিয়ে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলার দুই লক্ষাধিক জেলে।
ভোলার মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর ১৯০ কিলোমিটার এলাকা এবং বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশের জলসীমায় গত ৩ অক্টোবর রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরায় এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিলো। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মা ইলিশের ডিম ছাড়ার সময় মাছ ধরা, পরিবহন, সংরক্ষণ, মজুদ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় পুরোপুরি বন্ধ ছিলো।
ভোলা জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য বলছে, নিষেধাজ্ঞার ২১ দিনে সাতটি উপজেলায়—ভোলা সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, লালমোহন, তজুমদ্দিন, চরফ্যাশন ও মনপুরায় জেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে ৪৯৪টি অভিযান চালানো হয়। এতে দুই শতাধিক অসাধু জেলেকে আটক করা হয় এবং ১১৮ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া জব্দ করা হয় ৩ টন ৫৭৯ কেজি ইলিশ, ৪৩ লাখ ৮২৪ মিটার কারেন্ট জাল ও ৯টি বোট। জব্দকৃত জাল পুড়িয়ে বিনষ্ট করা হয়েছে, মাছ স্থানীয় মাদ্রাসাগুলোতে বিতরণ করা হয় এবং নৌযানগুলো নিলামে বিক্রি করেছে মৎস্য বিভাগ।
সরেজমিনে তুলাতুলি, ভোলার খাল, মেদুয়া ও আশপাশের নদী তীরবর্তী এলাকায় দেখা গেছে, নদীতে নামার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। কেউ জাল মেরামত করছেন, কেউ ট্রলারে জ্বালানি তুলছেন। আড়তদাররা আড়ত পরিষ্কার করছেন, নতুন মৌসুমের আশায় জেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
ভোলা সদর উপজেলার জেলে আব্বাস মাঝি, শাহে আলম, বিল্লাল ও রফিজল মাঝি জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে না গিয়ে সরকারের নির্দেশ মেনেই ছিলেন তাঁরা। তবে এতে পরিবার নিয়ে কষ্টে পড়েছেন। আব্বাস মাঝি বলেন, দাদন নিয়ে জাল-ট্রলার বানিয়েছি, কিন্তু মাছ না পাওয়ায় দেনা শোধ করতে পারিনি। এবার আশা করছি নদীতে গিয়ে ভালো মাছ পাবো, তাহলেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবো।
জেলে আব্দুল মন্নান, মহিউদ্দিন ও কবির অভিযোগ করেন, সরকার যে ২৫ কেজি চাল দিয়েছে তা এক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। বাকি সময় সংসার চালাতে হয়েছে ধার-দেনায়। তবুও আমরা নদীতে যাইনি, সরকারের নিয়ম মেনেছি, বলেন কবির মাঝি। এবার যদি মাছ ধরি, সব দেনা শোধ করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবো।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও মৎস্যজীবী জেলে সমিতির ভোলা জেলা সাধারণ সম্পাদক মো. এরশাদ বলেন, ভোলার জেলেরা নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে নামার প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে সরকারি সহায়তা ছিলো একেবারেই অপর্যাপ্ত। জেলেরা অনেক কষ্টে সময় পার করেছে। এখন মাছ ধরার মৌসুম কেমন যাবে, তা ২-৩ দিনের মধ্যেই বোঝা যাবে।
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, নিষেধাজ্ঞা শুরুর সময়ই জেলেদের চাল দেয়া হয়েছিলো। এখন তারা নদীতে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাছ পেলে বিগত ক্ষতি কিছুটা পূরণ করতে পারবে। আমরা চাই, মা ইলিশের প্রজনন রক্ষা হোক, আর জেলেরা তাদের শ্রমের ন্যায্য ফল পাক।
চলতি অর্থবছরে ভোলায় ইলিশের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন। জেলায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ২৮৩ জন, তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে সংখ্যা ছাড়িয়েছে দুই লাখ। এখন নদীতে ভেসে বেড়াচ্ছে একটাই আশা—এ মৌসুমে জালে ধরা পড়ুক কাঙ্ক্ষিত সোনালি ইলিশ, তবেই ঘুরে দাঁড়াবে ভোলার জেলেপাড়া।
সবার দেশ/কেএম




























